সাতক্ষীরার এক কৃষকের অসাধারণ মানবসেবা: ৮৫৮টি কবর খুঁড়ে ইতিহাস সৃষ্টি
বিত্তশালী হওয়া বা দারিদ্রতা কোনো বাধা নয়, প্রয়োজন শুধু ইচ্ছাশক্তি ও সৎ নিয়ত—এই বিশ্বাসে অটল সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের গণপতিপুর গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ আলী। পেশায় একজন সাধারণ কৃষক হলেও তিনি নিজের সীমিত আয় ও সম্পদ দিয়ে গত চার দশক ধরে নিরলসভাবে মানবসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
কবর খনন থেকে সমাজসেবা: এক অনন্য জীবনযাত্রা
মোহাম্মদ আলী আনুমানিক ২১–২২ বছর বয়স থেকে বিনা পারিশ্রমিকে গ্রামে মৃত ব্যক্তিদের দাফনের জন্য কবর খননের কাজ শুরু করেন। এ পর্যন্ত তিনি ৮৫৮টির বেশি কবর খুঁড়েছেন, যার মধ্যে ৬০৮টি কবরের নাম লিপিবদ্ধ আছে এবং প্রায় ২৫০টি কবরের নাম আগে লেখা হয়নি। তিনি জানান, অর্ধশত কবর তিনি একাই খুঁড়েছেন, আর বাকিগুলোতে এক বা একাধিক ব্যক্তি তার সাথে সহযোগিতা করেছেন।
তার এই সেবা শুধু কবর খননের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামে অসহায় মানুষের জন্য জমি কিনে কবরস্থান তৈরি করেছেন তিনি। এছাড়া, নিজের দানকৃত জমিতে মসজিদ নির্মাণেও তিনি সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। রমজান মাসে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মসজিদ ও বিভিন্ন বাড়িতে ইফতারের জন্য খিচুড়ি রান্না করেন, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সীমিত সম্পদে অসীম দান: একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প
মোহাম্মদ আলীর পরিবারে ১ ছেলে ও ১ মেয়ে আছে, দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি মাত্র ৪–৫ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে বছরের খোরাকি চালান। এই সীমিত আয় সত্ত্বেও তিনি নিজের মোটরসাইকেলে শাবল-কোদাল নিয়ে ছুটে যান মৃত ব্যক্তিদের কবর খুঁড়তে। তিনি বলেন, “মানুষের উপকার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই কাজ করে যাচ্ছি। যতদিন শারীরিক সক্ষমতা থাকবে, ততদিন এটি চালিয়ে যাব।”
তার এই নিরলস ও সাদাসিধে সেবার জন্য স্থানীয় সম্প্রদায়ের মানুষ তাকে গভীর সম্মান জানাচ্ছে। হেলাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “মোহাম্মদ আলীর সেবা গ্রামের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তার যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে আমরা প্রশাসনের কাছে লিখিত অনুরোধও দিয়েছি।”
একটি বার্তা: ইচ্ছাশক্তি ও সৎ নিয়তের শক্তি
মোহাম্মদ আলীর জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা নয়, বরং ইচ্ছাশক্তি ও সৎ নিয়তই পারে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে। তার কাজ কেবল সাতক্ষীরার কলারোয়াই নয়, সারাদেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, দারিদ্রতা বা বয়স কোনো বাধা হতে পারে না যখন হৃদয়ে থাকে মানুষের সেবার অদম্য ইচ্ছা।



