কৃষক কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত: ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পাবেন ১০ ধরনের সুবিধা
কৃষক কার্ড: ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পাবেন ১০ সুবিধা

কৃষক কার্ড বিতরণ: সরকারের নতুন উদ্যোগে কৃষকদের জন্য সুসংবাদ

কৃষি খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনার মতো সুবিধা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে কৃষকদের কার্ডের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। আগামী ৪ বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে, যার মাধ্যমে কৃষকদের কাঠামোগত বঞ্চনার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মৎস্যচাষি ও দুগ্ধখামারিরাও এ কার্ডের সুবিধা পাবেন, যা কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কৃষক কার্ডের সুবিধাসমূহ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। সুবিধার তালিকায় রয়েছে:

  • ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ
  • সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা
  • ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা
  • সহজ শর্তে কৃষিঋণ
  • কৃষি বিমাসুবিধা
  • ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা
  • কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ
  • আবহাওয়ার তথ্য
  • রোগবালাই দমনে পরামর্শ

এ কার্ডের মাধ্যমে জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষক সার কিনতে পারবেন, যা কৃষিজমিতে অতিরিক্ত সারের ব্যবহার বন্ধ করতে সাহায্য করবে। কৃষকের অন্যান্য ভাতা প্রাপ্তির কার্ড থাকলে সেটা এ কার্ডের অধীনে চলে আসবে, তবে সুবিধাগুলো কী পদ্ধতিতে দেওয়া হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং কয়েকটি উপজেলায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কৃষককে স্বীকৃতি দেওয়া ও তাঁর মর্যাদা নিশ্চিত করা। সোনালী ব্যাংকে প্রত্যেক কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট করা হবে, এবং প্রথম ধাপে ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জমির মালিকানা অনুযায়ী কৃষকদের শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে: ৫ শতাংশের কম জমির মালিক হলে ভূমিহীন, ৫ থেকে ৪৯ শতাংশের মালিক হলে প্রান্তিক এবং ৫০ থেকে ২৪৯ শতাংশ জমির মালিক হলে ক্ষুদ্র কৃষক।

কার্ডে কৃষকের ৪৫ ধরনের তথ্য থাকবে, এবং আর্থিক প্রণোদনার টাকা কৃষিতেই যেন ব্যয় হয় তা নিশ্চিত করা হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ১০টি উপজেলার ১০টি কৃষি ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে, যা এপ্রিলের মধ্যে শেষ হবে। এরপর ১৫টি উপজেলার সব কৃষককে নিয়ে কৃষক কার্ডের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে।

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও পরামর্শ

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেছেন, সরকারের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। প্রথমত, সঠিক কৃষক শনাক্ত করা একটি বড় সমস্যা হতে পারে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষকের তালিকা হালনাগাদ না থাকায় অ-কৃষক বা মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

সেলিম রায়হান আরও উল্লেখ করেন, ন্যায্যমূল্যে সার ও ডিজেলে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাজারে কৃত্রিম সংকট, দুর্নীতি বা অনিয়ম দেখা দিতে পারে, এবং স্থানীয় পর্যায়ে তদারকির অভাব থাকলে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এছাড়া প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় ঠিকভাবে না হলে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

তিনি সরকারকে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন, যেমন কৃষকদের একটি নির্ভুল ও ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা এবং সার-ডিজেল ও অন্যান্য ভর্তুকি বিতরণে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সরকারের অন্যান্য উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষক কার্ড অন্যতম অঙ্গীকার ছিল, এবং ইতিমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে বিএনপি সরকার। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে এ ঋণ মওকুফ করা হয়, যার পরিমাণ ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবং এতে কমপক্ষে ১২ লাখ কৃষক উপকৃত হবেন।

কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, সরকারি প্রণোদনা, ভাতা, ভর্তুকি কৃষকের জন্য সহজতর করতে কার্ড ভূমিকা রাখবে, এবং কৃষিসংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আগামী পয়লা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল) কৃষক কার্ডের উদ্বোধন করা হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, প্রাথমিকভাবে কৃষক কার্ডের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ বছরে ৬৮১ কোটি টাকা, তবে সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্যয় কমবেশি হতে পারে।

সরকারের লক্ষ্য হলো কৃষি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, কৃষকের সামগ্রিক আয় বৃদ্ধি, প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা, কৃষকের চাষাবাদের খরচ কমানো, কৃষিপণ্যের বিপণন প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং সব ধরনের ভর্তুকি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।