রাজশাহীর কৃষকের মানবিক উদ্যোগ: নতুন টাকায় ঈদের আনন্দ বিলানো
রাজশাহী বিভাগের মোহনপুর উপজেলার মেলান্দি গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন কৃষক হাফিজ উদ্দিন মৃধা এবারের ঈদে একটি অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি প্রায় ১,২০০ দুস্থ নারী-পুরুষকে নতুন টাকার নোট উপহার দিয়ে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছেন। এই উদ্যোগটি এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
গ্রামে গ্রামে নতুন টাকার বিতরণ
মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে অসচ্ছল মানুষরা ভ্যানে চেপে মেলান্দি গ্রামে আসছিলেন হাফিজ উদ্দিন মৃধার কাছ থেকে ঈদ উপহার নিতে। মহিষকুন্ডি, তুলসীক্ষেত্র ও আত্রাই গ্রামের নারী-পুরুষদের হাতে দেখা গেল নতুন ২০০ ও ১০০ টাকার নোট। ভ্যানচালক আনারুলও এই উপহার পেয়েছেন, যদিও তিনি যাত্রীদের কাছ থেকে স্বল্প ভাড়া নেন দারিদ্র্যের কারণে। রুনা বেগম নামের এক নারী বললেন, 'এবির নতুন ট্যাকাতেই আমারে ঈদ হবি।' তাঁর কথায় ফুটে উঠেছে এই উপহারের গুরুত্ব।
দশ বছর ধরে চলমান সহযোগিতা
হাফিজ উদ্দিন মৃধা প্রায় ১০ বছর ধরে তাঁর জাকাতের টাকা থেকে ঈদের আগে এলাকার দুস্থ মানুষদের সহযোগিতা করে আসছেন। আগে তিনি চিনি, সেমাই ও নারকেল বিতরণ করতেন, কিন্তু এবার ব্যাংক থেকে নতুন নোট সংগ্রহ করে প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, নতুন নোট হাতে পেলে মানুষ বেশি আনন্দ পাবেন। তাঁর এই উদ্যোগ মেলান্দি বেলনা, ঘড়বড়াইল, আত্রাই, গোছা, আতানারায়ণপুর, আতাপুর, পাইকপাড়া, ঘাসিগ্রাম, বড়দেউপুর, বাজেদেউপুর, গোয়ালপাড়া, মহিশকুন্ডি, তুলসীক্ষেত্র, বিশালপুর, দর্শনপাড়া ও ধানতৈড় গ্রামের মানুষদের কাছে পৌঁছেছে।
মানুষের জীবনের গল্প
এই উপহার পেয়ে অনেকের জীবনেই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। রুনা বেগম, যিনি ৩৫ বছর বয়সে স্বামী হারিয়েছেন এবং একটি মেয়েকে নিয়ে মায়ের কাছে থাকেন, বললেন এই ৫০০ টাকা তাঁর জন্য অনেক অর্থ। তাঁর মা মর্জিয়াও একই পরিমাণ টাকা পেয়েছেন। মিরা খাতুন নামের আরেক নারী, যাঁর স্বামী নেই এবং দুটি নাতি-নাতনিকে নিয়মিত রক্ত দিতে হয়, তিনি বললেন, 'এত মানুষকে কত করে দিতে পারে কন?' তাঁর কথায় প্রতিফলিত হয়েছে কৃতজ্ঞতা। ঘাসিগ্রামের লিমা বেগম, যাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলের ব্লাড ক্যানসার এবং স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন, তিনি এখন চাল কিনবেন নাকি ছেলের চিকিৎসা করাবেন তা নিয়ে চিন্তিত।
সমাজে ইতিবাচক প্রভাব
হাফিজ উদ্দিন মৃধার এই উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং সমাজে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বার্তা বহন করে। তিনি তাঁর আয় থেকে কর দেওয়ার পরও জাকাতের অংশ বিতরণ করে ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনা রাজশাহী বিভাগে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে এবং অন্যান্য ধনী ব্যক্তিদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। স্থানীয়রা তাঁর এই মানবিক কাজের জন্য প্রশংসা করছেন এবং আশা করছেন ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ চলমান থাকবে।



