রাঙামাটিতে হলুদের বাণিজ্যিক সাফল্য: দেশজুড়ে চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
রান্নার অপরিহার্য উপাদান হলুদ। এর স্বাদ, রং ও সুগন্ধ ছাড়া রান্নার কথা ভাবাই যায় না। ভাল হলুদ মানেই সুস্বাদু রান্না। এই গুরুত্বপূর্ণ মসলাটি উৎপাদনে রাঙামাটির পাহাড়ি অঞ্চল এখন দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আদিকাল থেকেই জুম চাষে হলুদ উৎপাদন করে আসছেন। পাহাড়ের উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া মসলাজাতীয় ফসল চাষের জন্য খুবই উপযোগী।
হলুদের ব্যাপক চাহিদা ও বাজার সম্প্রসারণ
পাহাড়ে উৎপাদিত হলুদের অনন্য রঙ, স্বাদ ও সুগন্ধের কারণে দেশজুড়ে এর চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাঙামাটি থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ সারাদেশে এই মসলা সরবরাহ করা হচ্ছে। পাহাড় মাড়িয়ে সমতলে দিন দিন পাহাড়ি হলুদের চাহিদা বাড়ায় স্থানীয় চাষীরা পাহাড়ের পাদদেশে এবং বাড়ির আঙ্গিনায় বাণিজ্যিকভাবে হলুদের চাষ বাড়িয়েছেন। বর্তমানে রাঙামাটিতে হলুদের বাণিজ্যের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
চাষ পদ্ধতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা
চৈত্র-বৈশাখ মাসে পাহাড়ে হলুদের চাষ করা হয় এবং ফাল্গুন মাস থেকে হলুদ সংগ্রহ করে শুকানো শুরু হয়। চাষীরা এসব শুকনো হলুদ বাজারে নিয়ে আসেন। স্থানীয় পাইকাররা এসব হলুদ সংগ্রহ করে ট্রাক ভর্তি করে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। জেলার চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি শুকনো হলুদ পাইকারী দামে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতিমণ হলুদ মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
জেলার সবচেয়ে বড় হলুদের বাজার সাফছড়ি ইউনিয়নের কুতুকছড়ি হাট। এখান থেকে পাইকাররা দরদাম করে হলুদ সংগ্রহ করে বাইরে নিয়ে যান। স্থানীয় ও বাইরের পাইকাররা প্রতিদিন এ হাটে ভীড় জমান। হলুদ চাষী বিক্রম চাকমা বলেন, গত বছরের মতো এ মৌসুমেও হলুদের ভাল দাম পাচ্ছি। প্রতিমণ শুকনো হলুদ মানভেদে নয় থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া ও বাজার বিশ্লেষণ
কুতুকছড়ি হাটে আসা হলুদ ব্যবসায়ী জাফর সাদিক বলেন, পাহাড়ি হলুদ রঙ ও স্বাদে অনন্য। সমতলে এখানকার হলুদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যে কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে এখান থেকে হলুদ সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে নিয়ে যাই। এরপর সেখান থেকে অর্ডার অনুযায়ী সারাদেশে বিক্রি করি।
কৃষি বিভাগের তথ্য ও সম্ভাবনা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটি জেলা কার্যালয় থেকে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দুই হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে হলুদের চাষ করা হয়েছে এবং এখান থেকে হলুদ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিকটন। ভাল ফলন পাওয়া গেছে, যার বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। কৃষি অফিস বলছে, পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়া মসলাজাতীয় ফসলের জন্য উপযোগী হওয়ায় রাঙামাটির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জমিতে ব্যাপক হারে হলুদের আবাদ হচ্ছে।
অল্প খরচ, কম শ্রম এবং বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকদের কাছে হলুদ একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এ বছর রাঙামাটিতে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিকটন হলুদ উৎপাদন হয়েছে। পাহাড়ে হলুদের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে উৎপাদন আরও বাড়বে এবং মাটি ক্ষয়ও কমবে।
তিনি আরও বলেন, বাইরে পাহাড়ি হলুদের বড় বাণিজ্য সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি পতিত জমিতে হলুদের চাষ বাড়ানো গেলে দেশের আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের আর্থিক স্বচ্ছলতা এনে দিচ্ছে এবং দেশের মসলা চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
