প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খনন উদ্যোগ: একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা
ক্ষণ গণনায় আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। ঈদের শুভেচ্ছা মিশ্রিত পরিবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারা দেশে ১৬টি খাল উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খাল দিয়ে শুরু হবে এই যাত্রা, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার ও সময়ের বিবর্তন
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে যশোরের শার্শায় উলাশী-যদুনাথপুর খাল খননের মাধ্যমে এই কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে মানিকগঞ্জের শিবালয়ের কাশাদহ খাল, নেত্রকোনার তিলকখালী খাল, বাগেরহাটের বড়বাড়িয়া খালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খাল খননের কাজ বিস্তৃত হয়। জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগ ছিল সময়ের অনিবার্য প্রয়োজন ও তাৎক্ষণিকতার সিদ্ধান্ত, যেখানে তারেক রহমানের খাল খনন কর্মসূচি নির্বাচনি ওয়াদা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ দ্রুত শুরু করা নিঃসন্দেহে একটি বিস্ময়কর ঘটনা, যা তার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মতোই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের খাল খননের উদ্দেশ্য প্রায় একই রকম: গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন এবং কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জন। তবে সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এই প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
খাল খননের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক প্রভাব
খাল খননের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো, যা শুরু হয়েছিল সেচ, নৌপরিবহন ও বাণিজ্যের সুবিধার্থে। প্রাচীন মিশরীয়, মেসোপটেমীয় ও চীনা সভ্যতায় নদীর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য খাল নির্মাণ করা হতো। আধুনিক যুগে ১৮৫৯-১৮৬৯ সালে নির্মিত সুয়েজ খাল বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে বিপ্লব এনেছে, যা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খাল খননের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল সেচ ও জল নিষ্কাশন। সময়ের প্রয়োজনে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, তিস্তা প্রকল্প ও মুহুরী সেচ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। জিয়াউর রহমান তার দূরদর্শিতা দিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেন, যা গ্রামীণ উন্নয়নে যুগান্তকারী মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
খাল খননের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
জিয়াউর রহমানের সময়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খাল খনন করে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বোরো আবাদ বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়েছিল। এটি খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড গড়তে সহায়তা করেছিল। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, যা শীতকালে পানির সংকট তৈরি করছে।
খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া ও নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে বর্ষাকালে তীব্র বন্যা এবং শীতকালে পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষি ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। খাল খননের মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবিলা ও একটি নতুন বাতাবরণ সৃষ্টির আশা করা যাচ্ছে।
বর্তমান উদ্যোগের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খনন কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য একটি মহৌষধ হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সবুজ বিপ্লবকে পুনরুজ্জীবিত করবে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে টেকনোলজির কার্যকর ব্যবহার, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও টেকসই পরিকল্পনার উপর। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এবার নতুন করে শুরু হওয়া কাজটি আশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খাল খননের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
