উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় চা উৎপাদনে ব্যাপক বৃদ্ধি, রেকর্ড পরিমাণে উৎপাদন
উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় চা উৎপাদনে ব্যাপক বৃদ্ধি

উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় চা উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় চা উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের চা শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার সমতল ভূমিতে চা উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ৫৮ লাখ কেজি বেড়েছে। ২০২৫ সালে এসব জেলায় মোট ২ কোটি ২ লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের চেয়ে ৫৮ লাখ ৫১ হাজার ৯০১ কেজি বেশি।

দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে উত্তরের জেলাগুলোর অবস্থান

সিলেট ও চট্টগ্রামের পর উত্তরাঞ্চলের এই পাঁচ জেলা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। চা উৎপাদনের দিক থেকে উত্তরাঞ্চল এখন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং টানা পাঁচবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের রেকর্ড ধরে রেখেছে। গত বছর শেষে জাতীয়ভাবে সারা দেশে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে উত্তরের পাঁচ জেলাতেই ২ কোটি কেজির বেশি উৎপাদন হয়েছে।

চা উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান ধারা ও ইতিহাস

উত্তরাঞ্চলে চা চাষের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন। ২০০০ সালে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় প্রথম চায়ের বাগান গড়ে তোলা হয়, এরপর ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র চাষি পর্যায়ে চা চাষ ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৭ সালে লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও এবং ২০১৪ সালে দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় চা চাষ শুরু হয়। ২০২১ সালে এসব জেলা সম্মিলিতভাবে চা উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে, ওই বছর ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে:

  • ২০২২ সালে: ১ কোটি ৭৭ লাখ ৫৯ হাজার ২২৬ কেজি
  • ২০২৩ সালে: ১ কোটি ৭৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৩০ কেজি
  • ২০২৪ সালে: ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯০ হাজার ১৫১ কেজি

চা বাগান ও চাষের পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত ১২টি ও অনিবন্ধিত ১৮টি বড় চা-বাগান (২৫ একরের বেশি) রয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ২২৫টি নিবন্ধিত ও ৬ হাজার ১৪৬টি অনিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তনের চা-বাগান (২৫ একরের কম) আছে। ২০২৪ সালে উত্তরাঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার ৫২৭ একর জমিতে চা চাষ হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১১ হাজার ৬০০ একরে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ চা চাষের জমি ৭৩ একরের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

অনলাইন নিলাম কেন্দ্র ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা

উত্তরাঞ্চলের চা চাষের পরিধি ও উৎপাদন বিবেচনায় ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ে চায়ের তৃতীয় নিলাম কেন্দ্র (অনলাইনভিত্তিক) চালু করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৫২টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অনুমোদন নিয়েছে, যার মধ্যে পঞ্চগড় জেলায় ৩০টি ও ঠাকুরগাঁও জেলায় ১টি কারখানা বর্তমানে চালু রয়েছে।

চাষিদের আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন বলেন, "গত বছর চা-চাষিরা কাঁচা চা-পাতার ভালো দাম পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে চা চাষে আগ্রহ বেড়েছে। এ জন্য চা চাষের পরিধিও কিছুটা বেড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরও চায়ের উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।" তাঁর মতে, চাষিদের আর্থিক সুবিধা ও সরকারি সহায়তা চা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

উত্তরাঞ্চলের চা শিল্পের এই অগ্রগতি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে আরও উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। চা বোর্ডের নীতিমালা ও স্থানীয় চাষিদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এই সাফল্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।