খুলনার বটিয়াঘাটায় গ্রামীণ বীজমেলা: নারীরা সংরক্ষণ করছেন হারিয়ে যাওয়া দেশি জাতের বীজ
বটিয়াঘাটায় গ্রামীণ বীজমেলা: নারীরা সংরক্ষণ করছেন দেশি বীজ

খুলনার বটিয়াঘাটায় গ্রামীণ বীজমেলায় নারীরা সংরক্ষণ করছেন হারিয়ে যাওয়া দেশি জাতের বীজ

বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা মিলনায়তনে এক অনন্য দৃশ্যের অবতারণা হয়। ছোট ছোট পাত্রে সাজানো ছিল তিলমুগ, পুঁইশাক, পালংশাক, মিষ্টিকুমড়া, লালশিম, ঝাড়শিম, ঢ্যাঁড়স, ধুন্দুল, ঝিঙে, শর্ষে, মরিচ, সুপারিসহ হরেক রকমের সবজি, শস্য ও ফলের বীজ। পাশাপাশি আম, কাঁঠাল, গাব, তুলসী, অর্জুন, ধুতরা, বাসকের বীজও ছিল চোখে পড়ার মতো। হারিয়ে যেতে বসা মরিচশাইল, রানীস্যালোট, হিজলি, দিঘা, মোরগশাইল, কালামানিকসহ নানা স্থানীয় জাতের ধানের বীজ এবং সুন্দরবনের গোলফল, সুন্দরী, ওড়া ও কেওড়ার বীজও এই সংগ্রহে স্থান পেয়েছে।

নারী কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম

যত্নে সাজানো এসব পাত্রের সামনে বসে ছিলেন একদল নারী কৃষক। তাঁদেরই একজন সত্তরের কাছাকাছি বয়সী ইছামতি বিশ্বাস, যিনি তাঁর সংগ্রহে নিয়ে এসেছিলেন ১৭০ জাতের বীজ। এই মেলায় ইছামতির মতো মোট ৫২ জন নারী তাঁদের সংরক্ষিত দেশি জাতের বীজ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। নিজেদের আঙিনা ও জমিতে উৎপাদিত এসব বীজ তাঁরা পরবর্তী চাষাবাদ ও পারস্পরিক বিনিময়ের জন্য তুলে রাখেন।

কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘লোকজ’‘মৈত্রী কৃষক ফেডারেশন’ যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করে। হারিয়ে যেতে বসা দেশি জাতের বীজ সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।

ইছামতি বিশ্বাসের গল্প

ইছামতি বিশ্বাসের বাড়ি উপজেলার সুখদাড়া গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নিতে যাওয়ার পথে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে তাঁর স্বামী নিহত হন। নিঃসন্তান ইছামতি বর্তমানে বোনের বাড়িতে থাকেন। তিনি বলেন, “সারা বছর বাড়ির আঙিনা ও খেতে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফল, ফুলের চাষ করি। পরিপক্ব বীজ আলাদা করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করি, যাতে পরবর্তী মৌসুমে আবার লাগানো যায়। কখনো প্রতিবেশীর কাছ থেকেও বীজ সংগ্রহ করি।”

কয়েক বছর ধরে এভাবে সংরক্ষণ করায় সাধারণত তাঁদের বাজার থেকে বীজ কিনতে হয় না। প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে বীজ পাওয়াটা সবচেয়ে বড় সুবিধা বলে মনে করেন ইছামতি।

অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা

ইছামতির পাশেই বসে ছিলেন একই গ্রামের দিপালী মণ্ডল, যিনি ৫০ জাতের বীজ নিয়ে অংশ নেন। দিপালী বলেন, “বীজ সংরক্ষণ শুরু করার পর থেকে সারা বছরই বাড়িতে সবজি ও ফল পাওয়া যায়। বাজারনির্ভরতা কমেছে। এসব দেশি বীজের ফসলে তুলনামূলক কম কীটনাশক লাগে, উৎপাদনও কম হয় না।”

ঝড়ভাঙা গ্রামের লক্ষ্মী রানী মণ্ডল নিয়ে আসেন ৪৭০ জাতের বীজ। তাঁর স্টলের পেছনে কর্কশিটে লেখা ছিল ‘লক্ষ্মী বীজ ভান্ডার’। লক্ষ্মী রানী বলেন, কয়েক বছর ধরে বীজমেলায় অংশ নিচ্ছেন এবং প্রতিবছরই তিনি নতুন নতুন জাত সংগ্রহ করছেন। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের আয়োজন গৃহিণীদের বীজ সংরক্ষণে আরও আগ্রহী করে তুলছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

বীজের সংখ্যা, বৈচিত্র্য, মান ও উপস্থাপনার ভিত্তিতে সেরা তিনজনকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রথম পুরস্কার পাওয়া করুণাময়ী মণ্ডল ধান, সবজি, ফল, ফুল ও ঔষধি বীজসহ ৩১৬ জাতের বীজ প্রদর্শন করেন। তিনি বলেন, “সারা বছর ধরে সংগ্রহ করা বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে কৌটায় ভরে রাখি। নিজেরা চাষাবাদ করি, আবার কিছু বীজ বিক্রিও করি।”

কাজীবাছা নদীর ওপারের হালিয়া গ্রামের ইতিকা রায় ৯৪ জাতের বীজ নিয়ে অংশ নেন। তিনি সুন্দরবন এলাকার কয়েক প্রজাতির বীজও আনেন। ইতিকা বলেন, “একই উপজেলায় হলেও সব গ্রামে সব ধরনের ফসল হয় না। তাই এ ধরনের মেলায় এসে বীজ বিনিময়ের সুযোগ পাওয়া যায়। এতে সংগ্রহ সমৃদ্ধ হয়।” ভবিষ্যতে আরও বেশি জাত সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া

মেলা দেখতে আসা জুঁই রায় বলেন, “নারীরা কীভাবে বীজ সংরক্ষণ করেন এবং সেগুলো থেকে চারা উৎপাদন করেন, তা সরাসরি দেখা ও শোনার সুযোগ হয়েছে। অনেক প্রজাতির বীজ আমি প্রথমবার দেখেছি।”

আয়োজকদের বক্তব্য

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ১৭টি গ্রামের নারীরা এই মেলায় অংশ নেন। দেশি জাতের বীজ সংরক্ষণকারীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা ও বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রতিবছর এই আয়োজন করা হয়।

লোকজের নির্বাহী পরিচালক দেবপ্রসাদ সরকার বলেন, “আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তারের কারণে অনেক আদি জাত হারিয়ে যাচ্ছে। প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এতে কৃষকের ঝুঁকি বাড়ে। আমরা কিষান-কিষানিদের দেশি জাত সংরক্ষণে উৎসাহিত করছি। এই মেলার মাধ্যমে তাঁরা একে অপরের সঙ্গে বীজ বিনিময় করতে পারছেন।”

প্রশাসনের সমর্থন

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থান্দার কামরুজ্জামান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের এ সময় দেশীয় জাতের বীজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রান্তিক নারী কৃষকেরা যেভাবে বংশপরম্পরায় এসব বীজ সংরক্ষণ করছেন, তা প্রশংসনীয়।”

এই মেলা শুধু বীজ বিনিময়ের মাধ্যমই নয়, বরং স্থানীয় কৃষি ঐতিহ্য রক্ষা এবং নারী ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে।