যশোরের বিলে জলাবদ্ধতা: বোরো চাষে বিপর্যয়
যশোরের ভবদহ অঞ্চলের বিলগুলো গত বর্ষার পানিতে এখনো তলিয়ে রয়েছে, জলাবদ্ধতার কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ ব্যাহত হয়েছে। অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার কৃষকরা এবারও তাদের জমিতে ফসল ফলাতে পারেননি, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
কৃষকদের দুর্ভোগ ও জলাবদ্ধতার চিত্র
যশোরের অভয়নগর উপজেলার বেদভিটা গ্রামের কৃষক পরিমল বিশ্বাস (৫৪) বলেন, 'বিল কেদারিয়ায় আমার ছয় বিঘা জমি আছে, কিন্তু সেখানে এখনো বুকসমান পানি। এবার এক শতক জমিতেও বোরো চাষ করতে পারিনি।' তাঁর মতো অনেক কৃষক প্রতিবছর বর্ষাকালে বাড়িতে পানি ওঠার সমস্যায় ভোগেন, কিন্তু এবার বিলের পানি না নামায় ফসল চাষ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ভবদহ অঞ্চলে অন্তত ৫২টি ছোট-বড় বিল রয়েছে, যেগুলো মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীর সঙ্গে যুক্ত। তবে পলি পড়ায় নদীগুলো নাব্যতা হারিয়েছে, ফলে পানি নিষ্কাশন ঠিকমতো হয় না। গত বছরের জুলাই-আগস্ট অতিবর্ষণে এই অঞ্চলের দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়, দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে দুর্ভোগে পড়েন।
বোরো চাষের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভবদহ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার কৃষক আছেন, যেখানে ২৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হতো। এবার তিন উপজেলায় মোট ১৭ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে, কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমিতে চাষ করা যায়নি।
তবে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হামিদ দাবি করেন, 'কৃষি অফিসের তথ্য বিভ্রান্তিকর, প্রকৃতপক্ষে অনেক বেশি জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে না।' বিল বোকড়, বিল কেদারিয়া, বিল ঝিকরা প্রভৃতি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিলগুলো শুধু পানিতে ভরা, কোনো ধানখেত নেই।
কৃষকদের সংগ্রাম ও সরকারি উদ্যোগ
মনিরামপুর উপজেলার নেবুগাতী গ্রামের কৃষক বিমল রায় (৬৮) বিল বোকড়ে ৯ বিঘা জমির মালিক, কিন্তু পানির কারণে মাত্র দেড় বিঘা জমিতে সেচযন্ত্র দিয়ে বোরো চাষ করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, 'বিলে ৫ থেকে ৭ ফুট পানি থাকায় বাকি জমিতে চাষ সম্ভব হয়নি।'
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, নদী পুনঃখননের কাজ চলছে এবং বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইসগেট খোলা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, 'এলাকার বিলগুলোয় গত বছরের চেয়ে এবার বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে, তবে চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে।'
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সমাধানের পথ
কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্ল্যাহ আল মামুন উল্লেখ করেন, 'কৃষকেরা সেচযন্ত্র দিয়ে চাষের চেষ্টা চালিয়েছেন, কিন্তু নদীতে বাঁধ দেওয়ায় পানি নামতে পারেনি।' জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি ভবদহ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলেছে, এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।
