বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক: নিওলিবারেল ব্যবস্থায় বন্দী এক জীবনযুদ্ধের গল্প
হালচাষ শেষে লাঙল কাঁধে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন কৃষক—এই দৃশ্য আজ বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। রানীরপাড়া, গাবতলী, বগুড়ার মতো এলাকায় এখনও কিছুটা টিকে থাকলেও দেশের বৃহত্তর কৃষি ভূগোল এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের ‘হাটিবান্ধা’ গ্রামগুলো রামসার জলাভূমি হিসেবে পরিচিত হলেও এখানকার বসতি আজ হুমকির সম্মুখীন।
হাওর থেকে সুন্দরবন: ক্রমাগত সংকটের ছবি
হাওর অঞ্চলের গ্রামগুলো লোকায়ত স্থাপত্য ও সামাজিক ঐক্যের ঐতিহাসিক নমুনা হিসেবে টিকে ছিল। কিন্তু এখন এসব গ্রাম ক্রমাগত ভাঙনের দিকে এগোচ্ছে। ‘বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও’ যোগাযোগের ঐতিহ্যবাহী ধারা আজ বদলে গেছে। জমিন কমছে, জলাভূমি উধাও হচ্ছে, বিলগুলো বন্যার পলিতে ভরে উঠছে। মাছ ধরার নামে কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি, রাসায়নিক বিষ ও ইলেকট্রিক শকের ব্যবহার মাছের বংশ ধ্বংস করছে।
গভীর পানির ধান যেমন রাতা, বইয়াখাওড়ি, লাখাই, হাতিবান্ধা, সকালমুখী, সমুদ্রফেনা, কালি বোরো আজ প্রায় নিখোঁজ। কৃষকের ঘর বীজশূন্য হয়ে পড়েছে। কোম্পানির হাইব্রিড বীজ, সিনথেটিক সার, বিষ ও কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবসার কবলে বন্দী হয়েছে হাওরের কৃষি ব্যবস্থা। নল-নটার বন, হিজল-করচবাগ উধাও হয়ে গেছে। উজানের মেঘালয় পাহাড় থেকে নামা ঢল ও বালুতে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ, বিছরাখেত, বিল ও গোচারণভূমি।
গ্রাম ছাড়ছে মানুষ, বদলে যাচ্ছে জীবিকা
গ্রামে রোজগার ও আয়ের পথ কমে যাওয়ায় দলে দলে হাওর ছাড়ছেন মানুষ। তারা কাজ নিচ্ছেন পাথরখনি, ইটের ভাটা বা দূর শহরের দিনমজুরিতে। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে মান্দি-কোচ অধ্যুষিত অঞ্চলের আচিক নাম ‘আবিমা’ বা মাতৃগর্ভভূমি। মধুপুরের আনারস জিআই সনদ পেলেও মিজি সাংমার শুরু করা মিশ্র ফসলের ঐতিহ্য রাষ্ট্র সুরক্ষিত রাখেনি।
বাণিজ্যিক বাগানের কারণে এই গড়াঞ্চল আজ করপোরেট বিষের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ১৯৫০ সালে জুম আবাদ নিষিদ্ধ, ১৯৬২ সালে জাতীয় উদ্যান, ২০০৪ সালে ইকোপার্ক, রাবার ও আগ্রাসী গাছের বাগান, মিথ্যা বন মামলা, উচ্ছেদ নোটিশ, বিমানবাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ—এসব নানাভাবে এই বনাঞ্চল ও বাসিন্দাদের যন্ত্রণার ভেতর রেখেছে। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিবঞ্চনার জন্য আত্মহত্যা করেছেন কৃষক। সুন্দরবন উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ছে, জীবিকা হারিয়ে ইটের ভাটায় বিক্রি হচ্ছেন কৃষক।
কৃষি আজ কৃষকের হাতে নেই
দেশজুড়ে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা আজ আর কৃষকের নিয়ন্ত্রণে নেই। কৃষক আজ নিওলিবারেল ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত খাদ্যবাজারের এক বন্দী মজুরমাত্র। চাষাবাদ থেকে বিপণন—কোথাও কৃষকের পছন্দ ও সিদ্ধান্তের স্থান নেই। জমি, জলা, প্রাণসম্পদ, পদ্ধতি কিংবা উপকরণ সবই ক্ষমতার বলয়ে জিম্মি। কৃষি ও কৃষকের মুক্তির প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
পাগলপন্থী, নানকার, টংক, তেভাগা বা ভানুবিল কৃষক বিদ্রোহের আওয়াজ ক্রমেই রাষ্ট্র ও এজেন্সি দ্বারা বিচূর্ণ হয়েছে। ১৯৪১-৪২ সালে প্রকাশিত কৃষিকথা সাময়িকীতে কৃষি ও কৃষকের দুর্গতি ও বঞ্চনার কথা উল্লেখ আছে। ১৯৬৪ সালে পাবনায় প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের ভাষণে মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘কৃষকেরা দুনিয়ার লোকের আহার জোগান; অথচ সমাজে কৃষকের স্থান নাই।’
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও অঙ্গীকার
নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব অঙ্গীকার করেছে, তা পূরণের জন্য এখনই সক্রিয় হওয়া জরুরি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’-এ খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্যসার্বভৌমত্ব অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই কৃষিনীতি অবলম্বনের ঘোষণা দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ‘জনতার ইশতেহার’-এ আত্মনির্ভরশীল কৃষির অঙ্গীকার করে কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও কৃষিপণ্যের বিপণনে সিন্ডিকেট ভাঙার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তাদের ২২ দফায় মধ্যস্বত্বভোগী নির্মূল, ভাতের অধিকার, সুদমুক্ত ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলেছে।
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকে শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামের ৫১ দফায় কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরের অঙ্গীকার করে আত্মনির্ভর, জলবায়ুসহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।
কৃষকের হাতে ফিরবে কি কৃষির চাবি?
ইশতেহারগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবুজ বিপ্লব প্রকল্পের চাপিয়ে দেওয়া ‘অধিক উৎপাদন দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকে বহু রাজনৈতিক দল সরে এসেছে। তাদের ইশতেহারে নিরাপদ ও ন্যায্য কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার আওয়াজ পাওয়া যায়। তবে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করলেই কি কৃষকের হাতে আবারও ফেরত আসবে কৃষির চাবি? নিশ্চয়ই নয়; কারণ এই চাবি ফেরতের লড়াই এক ধারাবাহিক রূপান্তরপ্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৭ সালের গবেষণা জানায়, তাদের ভর্তি ক্যানসার রোগীর প্রায় ৬৪ শতাংশই কৃষির সঙ্গে জড়িত। আধুনিক কৃষির নামে বাণিজ্যিক খাদ্য উৎপাদনপ্রক্রিয়া আমাদের থালায় প্রতিদিন হাজির করছে বিষাক্ত ঝুঁকিপূর্ণ খাবার। মাটি, পানি, বীজ, বায়ু, বাজারসহ কৃষকের চারধার নিরাপদ না হলে আমাদের ভাতের থালাও নিরাপদ হবে না।
বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর একটি লেখায় দেখিয়েছেন, হাইব্রিড বীজ কীভাবে দেশীয় কৃষির ক্ষতি করছে। তাঁর ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় এলাকায় আমন ও আউশ মৌসুমে নানা স্থানীয় ধানের আবাদ হতো, যা জলবায়ুসহিষ্ণু ও স্থানীয় প্রতিবেশ-উপযোগী ছিল। কৃষকের কৃষি ছিনতাই করে বহুজাতিক কোম্পানিনির্ভর বিষাক্ত বিপজ্জনক যে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা আমরা বহাল রেখেছি, তা বিএনপি-ঘোষিত ‘কৃষককেন্দ্রিক জলবায়ুসহিষ্ণু আত্মনির্ভর’ কৃষিদর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আশা করা যায়, নিরাপদ ও ন্যায্য কৃষির লক্ষ্যে দেশের সব প্রান্তের সর্বজনের মতামত ও অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে সরকার দ্রুত নানা মেয়াদি তৎপরতা গ্রহণ করবে। ৩০টি প্রতিবেশ অঞ্চলে অন্তত একটি করে ‘কৃষককেন্দ্রিক জলবায়ুসহিষ্ণু আত্মনির্ভর’ কৃষিগ্রাম গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে উঠবে কৃষকের বীজঘর। নতুন প্রজন্মের জন্য কৃষক পরিচয় আকাঙ্ক্ষার হয়ে উঠবে। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার মুক্তির লক্ষ্যে ভাতের থালাকে পাঠ করবার জনভাষ্য জোরালো হবে।
