রাজশাহীতে বোরো ধান রোপণের উৎসব শুরু
রাজশাহী জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠে মাঠে এখন চলছে বোরো ধান রোপণের উৎসব। কৃষকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন বীজ তোলা এবং চারা রোপণের কাজে। চলতি মৌসুমে জেলার নয়টি উপজেলায় ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো রোপণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন তারা। এই জমি থেকে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৩০৩ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতি
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্র অনুযায়ী, এবার জেলার নয়টি উপজেলা তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, বাগমারা, পবা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাঘা ও চারঘাট মিলিয়ে প্রায় ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া এই রোপণ কার্যক্রম চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। কনকনে হাড় কাঁপানো শীত উপেক্ষা করেই কৃষকরা কাজ শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে বোরো রোপণ সম্পন্ন হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক। বিশেষ করে গোদাগাড়ী, তানোর, পবা ও মোহনপুরের মাঠগুলো এখন কৃষকদের কর্মতৎপরতায় মুখরিত হয়ে উঠেছে।
কৃষকদের আশা ও উদ্বেগ
পবা উপজেলার দারুশা এলাকার কৃষক মতিউর রহমান বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে চাষাবাদ করি। এবার শীতটা একটু বেশি ছিল, তাই বীজতলা তৈরি করতে শঙ্কা ছিল। কিন্তু কৃষি অফিসের পরামর্শে পলিথিন দিয়ে ঢেকে চারাগুলো রক্ষা করেছি। এখন চারা বেশ শক্ত হয়েছে। আশা করছি ফলন ভালো হবে।’ তবে শুধু আশার কথা নয়, খরচের দুশ্চিন্তাও ভর করেছে অনেক কৃষকের মনে। তানোর উপজেলার কৃষক সফিকুল ইসলাম জানান, ‘সবকিছুর দাম বাড়ছে। ডিজেলের দাম আর সারের দাম বাড়ার কারণে এবার চাষের খরচ একটু বেশি পড়বে। আমরা যারা বর্গাচাষি, তাদের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করে, তবেই আমাদের কষ্ট সার্থক হবে।’
আধুনিক পদ্ধতি ও নতুন জাতের ধান
এ বছর রাজশাহীর মাঠগুলোতে আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষকরা ব্রি ধান-২৮ বা ২৯-এর পাশাপাশি নতুন উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ব্রি ধান-৮৯, ব্রি ধান-৯২ এবং জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান-১০০ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। গোদাগাড়ীর কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে পুরোনো জাতের ধান লাগাতাম, ফলন কম হতো। এবার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে নতুন জাতের বীজ লাগিয়েছি। খরচ আগের মতোই। কিন্তু ফলন কয়েক মণ বেশি হবে শুনছি। সেটাই এখন বড় ভরসা।’
সেচ সুবিধা ও সরকারি সহায়তা
বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তবে এবার বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া বাজারে যাতে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সেই ব্যাপারে সরকারের প্রতি লক্ষ্য রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন কৃষকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার বলেন, ‘রাজশাহী জেলায় বোরো রোপণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেক জমিতে রোপণ করা সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বোরো রোপণ সম্পন্ন হবে। কৃষকরা যাতে ভালোভাবে আবাদ করতে পারেন সেই ব্যাপারে সরাসরি কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকের লাভ নিশ্চিত করা।’
সামগ্রিকভাবে, রাজশাহীতে বোরো ধান রোপণের এই উৎসব কৃষি খাতের উন্নয়নের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে, যেখানে কৃষকদের দৃঢ়তা এবং সরকারি সহায়তা একত্রিত হয়ে একটি সমৃদ্ধ ফসলের স্বপ্ন বুনছে।
