বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ায় সীমান্তবর্তী চা-বাগানে কালো তিতির পাখির ডাক শোনা যায়। তবে ডাক শুনলেই পাখি দেখা যায় না, কদাচিৎ দর্শন মেলে। এই পাখির দুটি অদ্ভুত স্থানীয় নাম রয়েছে: ‘পান বিড়ি সিগারেট’ এবং ‘শেখ ফরিদ’। স্থানীয় লোকেরা কালো তিতির নামে না চিনে এই দুই নামেই চেনেন। প্রথমবার নাম শুনে মনে হয়েছিল কেউ রসিকতা করছে।
কালো তিতিরের সন্ধানে আলোকচিত্রীদের ভিড়
সারা দেশ থেকে পাখির আলোকচিত্রীরা কালো তিতির ও ময়ূরের ছবি তোলার জন্য পঞ্চগড়ে যান। লেখক নিজেও কয়েকবার গিয়েছেন। অতীতে ঘন চা-বাগানের ভেতরে কালো তিতিরকে হাঁটতে বা ক্ষিপ্র গতিতে উড়তে দেখেছেন। তবে ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি নদীর কাজে পঞ্চগড়ে যাওয়ার সুযোগ হলে তেঁতুলিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তেঁতুলিয়ায় আগমন
রংপুর থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। দুইবার বাস বদল করে প্রায় ছয় ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। চিকিৎসক ও পাখির আলোকচিত্রী রকিবুল আলম চয়ন আগেই জানিয়েছিলেন কালো তিতির পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে কর্মরত। আরও দুই আলোকচিত্রীসহ তিনি সকালে তেঁতুলিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। লেখকের সঙ্গে প্রকৌশলী ফজলুল হকও ছবি তুলতে যান। রাত সাড়ে নয়টায় তেঁতুলিয়া পৌঁছে মহানন্দার পাড়ে অন্যান্য আলোকচিত্রীদের সঙ্গে দেখা হয়।
ভোরের আলোয় কালো তিতিরের সন্ধান
সকাল সাড়ে পাঁচটায় তেঁতুলিয়া বাজারে রকিবুল আলম, রেজাউল হাফিজ ও আহমেদ কবীর এসে পৌঁছান। তাঁরা ভোর চারটায় ঠাকুরগাঁও থেকে রওনা হয়েছিলেন। পাঁচজন মিলে চা-বাগানে যান, যেখানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অংশে পাখি দেখা যায়। প্রথমে ময়ূর দেখার জায়গায় গেলেও সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ময়ূর চা-বাগানে নেমে যায়।
কালো তিতিরের দেখা ও ছবি তোলা
সবাই মিলে কালো তিতিরের সন্ধান করতে থাকেন। রেজাউল হাফিজ গরম পানি ও টি ব্যাগ এনেছিলেন, ফাঁকে চা খাওয়া হয়। রকিবুল আলম উত্তেজিত হয়ে প্রথমে একটি কালো তিতির দেখান। পাখিটি চা-বাগানে আড়ালে চলে যায়, তবে একটি ছবি তোলা সম্ভব হয়। পাখির আলোকচিত্রীদের কাছে এটিকে ‘সাক্ষী ছবি’ বলা হয়। এরপর এক জোড়া কালো তিতির হেঁটে হেঁটে খাবার খুঁজতে দেখা যায়। জোড়া কালো তিতির দেখে ভীষণ আনন্দ হয় এবং ছবি তোলা হয়। ভোরের আলোয় চারদিকে তিতিরের ডাক শোনা যাচ্ছিল। রেজাউল হাফিজ জানান, ডাক যত কাছের মনে হয়, তত কাছে নয়।
কালো তিতিরের বৈশিষ্ট্য ও আচরণ
রেজাউল হাফিজ ও আহমেদ কবীর প্রায় ১০ বছর ধরে নিয়মিত এ পাখির সন্ধান করেন। তাঁদের মতে, এ বছর যতটা সময় ধরে দেখা গেছে, অতীতে এ রকম হয়নি। পাঁচ-সাত মিনিট ধরে দেখা পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। এপ্রিল থেকে কালো তিতিরের প্রজনন সময় শুরু হয়। পুরুষ পাখির মাথা কালো, চোখের নিচে সাদা, গলায় লালচে অংশ, পিঠ কালো-সাদা মিশেল ও তিলা তিলা সাদা দাগ। পেট কালো। স্ত্রী পাখি বাদামি রঙের ওপর সাদাটে ছোট-বড় তিলা দাগযুক্ত, মাথায় হলদেটে রং ও চোখ কালো। ইংরেজি নাম Black Francolin, বৈজ্ঞানিক নাম Francolinus francolinus।
স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ও পাখির ভবিষ্যৎ
কালো তিতিরের আচরণ দেশীয় মুরগির মতো। মাটি থেকে খাবার সংগ্রহ করে এবং ঝোপঝাড়ে বাসা করে। স্থানীয় লোকেরা কখনো ৮-১০টি বাচ্চা নিয়ে চলাফেরা করতে দেখেছেন। পাখিটি খুব সাবধানী, সামান্য শব্দেই সটকে পড়ে। কেউ কেউ এটি শিকার করে খায়। বাংলাদেশের দুর্লভ এই পাখিটি ভালোভাবে টিকে থাকুক, এটি সবার প্রত্যাশা।



