বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সংকট শুধু সেখানকার প্রাণপ্রকৃতিতে বিপর্যয় ডেকে আনছে না; লাখ লাখ মানুষের জীবন–জীবিকাকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কারণে মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফার মারা যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টি হলেও মাটির নিচে পানি জমছে না। এতে একদিকে যেমন সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অন্যদিকে খাওয়ার পানি সংগ্রহে মানুষকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। উদ্ভূত বাস্তবতায় বরেন্দ্র অঞ্চলকে পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে পানি তোলা ও ব্যবহারে ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হলেও বাস্তবে সেটা মানা হচ্ছে না। আমরা মনে করি, জরুরি ভিত্তিতে বরেন্দ্র অঞ্চল ঘিরে একটি টেকসই ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি হয়ে উঠেছে।
পানিসংকটের বিস্তৃতি
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই তিন জেলার ২৫ উপজেলায় পানিসংকট দেখা দিয়েছে। এই তিন জেলার অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হলো ৪৭ ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা, উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হলো ৪০ ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা, মধ্যম পানিসংকটাপন্ন এলাকা হলো ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজা। বরেন্দ্র অঞ্চলের যে ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটারজুড়ে পানিসংকট তৈরি হয়েছে, সেখানে ২১ লাখ মানুষ বসবাস করছেন। এর মধ্যে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীও রয়েছেন, যাঁদের একমাত্র জীবিকা কৃষি। পানির অভাবে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কৃষি উৎপাদনসহ সেখানকার মানুষের জীবিকা ও জীবনযাপনের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ইতিহাস
প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত না করে শুধু উৎপাদন ও মুনাফাকেন্দ্রিক নীতি যে কতটা মারাত্মক ও বহুমুখী সংকট তৈরি করে, বরেন্দ্র অঞ্চল তার পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ হতে পারে। ১৯৮৫-৮৬ সালে সেচকাজে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এরপর ১৯৯৩ সাল থেকে এ কাজ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এই তিন জেলার পানিসংকটাপন্ন এলাকায় সেচকাজে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নির্দেশনা অমান্য করে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও ৪ হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এই চিত্রই বলে দেয় খুব স্বাভাবিকভাবেই মাটির নিচ থেকে যতটা পানি তোলা হচ্ছে, সেই পরিমাণ পানি পুনর্ভরণ হচ্ছে না। পানির স্তর ক্রমে নামছেই।
সরকারের বিধিনিষেধ ও বাস্তবতা
দীর্ঘদিন ধরেই বরেন্দ্রকে পানিসংকটাপন্ন অঞ্চল বলে ঘোষণার দাবি করে আসছিলেন পরিবেশকর্মী ও ভূতত্ত্ববিদেরা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এটিকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ রাখা, খাল, বিল, পুকুর, নদী তথা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং জলাশয়গুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখাসহ ১১টি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে পানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত না করা গেলে দণ্ডনীয় হলেও জনগণের পক্ষে এমন বিধিনিষেধ মানাটা দুরূহ। সে ক্ষেত্রে খাঁড়ি ও পুকুরগুলো খনন ও পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি ধারণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সেখানে পানি কম প্রয়োজন হয়, এমন ফসল ও শস্য উৎপাদনে কৃষককে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
ওয়াটার লর্ডশিপ ও করণীয়
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকটকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের যে ‘ওয়াটার লর্ডশিপ’ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটা ভাঙাটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বিএমডিএকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
উপসংহার
আমরা মনে করি, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বরেন্দ্র অঞ্চলকে আরও মরুকরণ ও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না। সরকারকে অবশ্যই বরেন্দ্র বাঁচাতে টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।



