ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেওয়া কোটি কোটি ইউরো কৃষি ভর্তুকির সুবিধা নিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাজপরিবার। এই ভর্তুকির অর্থে ইউরোপের মাটিতে উৎপাদিত ফসল চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ও ‘ডিসমগ’-এর এক যৌথ অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ভর্তুকি প্রবাহের চিত্র
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রোমানিয়া, ইতালি ও স্পেনে নিজেদের খামারের জন্য গত ছয় বছরে ৭ কোটি ১০ লাখ ইউরোর বেশি ভর্তুকি নিয়েছে আল–নাহিয়ান পরিবার। আল–নাহিয়ান পরিবার বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী পরিবার। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩২ হাজার কোটি ডলারের বেশি। এ অর্থ দেশটির তেলের খনি থেকে আসে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট বাজেটের এক-তৃতীয়াংশই খরচ হয় তাদের সাধারণ কৃষি নীতিমালা বা ‘ক্যাপ’-এর ভর্তুকি দিতে। এই খাতের আওতায় ইইউভুক্ত দেশগুলোর কৃষক ও গ্রামীণ এলাকার জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি ইউরো ব্যয় করা হয়। তবে এই তহবিলের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে। এমনকি এর সুবিধা পাচ্ছে বিভিন্ন স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোও।
অনুসন্ধানের ফলাফল
স্পেনের ‘এল ডায়েরিও’ ও রোমানিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘জি ফোর মিডিয়া’–এর সঙ্গে যৌথভাবে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভর্তুকি পাওয়া হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে ডিসমগ। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউরোপের ১১০টি ভর্তুকির অর্থ আমিরাতের রাজপরিবার ও তাদের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা এডিকিউ-এর নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন কোম্পানির কাছে গেছে।
ভর্তুকির সবচেয়ে বড় অঙ্কটি পেয়েছে রোমানিয়ার কৃষি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাগ্রিকোস্ট’। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক বৃহত্তম এই খামারের আয়তন ৫৭ হাজার হেক্টর, যা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের চেয়ে পাঁচ গুণ বড়। মূলত ইইউর এই কৃষি ভর্তুকির বড় অংশই চলে যাচ্ছে বড় ভূস্বামীদের পকেটে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর ২০২৪ সালের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মাত্র ১৭ জন বিলিয়নিয়ার ৩০০ কোটি ইউরোর বেশি ভর্তুকি পেয়েছেন। কেবল ২০২৪ সালেই ‘অ্যাগ্রিকোস্ট’ সরাসরি ১ কোটি ৫ লাখ ইউরো ভর্তুকি পেয়েছে। এই অঙ্ক ইউরোপের একটি সাধারণ খামারের পাওয়া অর্থের চেয়ে ১ হাজার ৬০০ গুণেরও বেশি।
বিতর্ক ও উদ্বেগ
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে নির্যাতনের নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা নিয়মিত ইইউর কৃষি ভর্তুকি পাচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা। তবে নির্যাতনের এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে আমিরাত।
অধিকার রক্ষাবিষয়ক সংগঠন ‘ইউরোপীয় এনভায়রনমেন্ট ব্যুরো’–এর পরিচালক ফস্টিন বাস-ডিফোসেজ বলেন, ‘ভর্তুকির এই নীতি (ক্যাপ) ইউরোপের কৃষকদের কোনো উপকারে আসছে না। এটি শুধু ধনী ভূস্বামীদের সম্পদ বাড়াচ্ছে। এর চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, এই অর্থ এখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে মদদ দিচ্ছে।’
আমিরাতের কৃষি সম্প্রসারণ
বিগত ১৫ বছরে আমিরাতের রাজবংশ বিশ্বজুড়ে কৃষি খাতে নিজেদের বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে তারা বিপুল জমি ও কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়েছে। আমিরাতের এই সম্প্রসারণ মূলত তাদের খাদ্যনিরাপত্তা কৌশলের অংশ। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানির সংকটের কারণে দেশটিতে চাষাবাদ বেশ কঠিন। বর্তমানে আমিরাতকে তাদের খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়।
২০১৮ সালে আমিরাতের কৃষিভিত্তিক গ্রুপ ‘আল-দাহরা’–এর মাধ্যমে আনুমানিক ২৩ কোটি ইউরো দিয়ে অ্যাগ্রিকোস্ট কিনে নেয় আল-নাহিয়ান পরিবার। স্পেন ও রোমানিয়ায় আমিরাতের এসব খামারে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘আলফালফা’ ও অন্যান্য ফসল চাষ করা হয়। এসব ফসলের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়। আমিরাত সরকারের সঙ্গে আল-দাহরা’–এর দীর্ঘমেয়াদি পশুখাদ্য সরবরাহের চুক্তি রয়েছে, যা মূলত দেশটির দ্রুত বর্ধনশীল দুগ্ধ খাতের জন্য ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অস্ট্রিয়ার গ্রিন পার্টির ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য (এমইপি) থমাস ওয়েইৎস বলেন, আরব আমিরাতের এই ভর্তুকি পাওয়া সবার চোখের সামনে ঘটা এক বড় কেলেঙ্কারি। তিনি বলেন, ইউরোপের ৯৯ শতাংশ আসল কৃষক ১ লাখ ইউরোর কম ভর্তুকি পান। এই টাকা তেল ব্যবসার মালিক রাজবংশগুলোর জন্য ছিল না। এটি ছিল মূলত ইউরোপের প্রকৃত কৃষকদের শক্তিশালী করার জন্য।
কাগজে-কলমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হলেও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘এডিকিউ’ মূলত আরব আমিরাতের ক্ষমতাসীন রাজপরিবারই নিবিড়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দমনমূলক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের রাজকোষ আর রাজপরিবারের তহবিলের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা বা তফাত থাকে না।



