বাংলাদেশের কোনো এক পাহাড়ি নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছ তুমি। পানি একদম স্বচ্ছ। নিচে পাথর দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, এই পানির নিচে যদি এমন কোনো প্রাণী থাকে, যে পৃথিবীতে ছিল ডাইনোসরের সময়েও? শুনতে গল্প মনে হলেও এমন একটা মাছ সত্যিই আছে। নাম তার মহাশোল। বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘Mahseer’। তবে আগে একটা ভুল ভাঙানো দরকার। মহাশোল ঠিক সেই অর্থে ডাইনোসরের সময়ের ‘লিভিং ফসিল’ নয়। যেমন Coelacanth—এ মাছকে প্রায় হুবহু প্রাগৈতিহাসিক যুগের মতোই পাওয়া গেছে। মহাশোল একটু আলাদা। কিন্তু এর গল্প কম মজার নয়।
পুরোনো বংশের উত্তরাধিকার
মহাশোল আসলে কার্প গোত্রের মাছ। মানে Cyprinidae পরিবারের সদস্য। এই গোত্রের মাছ পৃথিবীতে আছে বহু বছর ধরে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এদের পূর্বপুরুষেরা মিলিয়ন বছর আগে থেকেই পৃথিবীতে ছিল। মানে, সরাসরি ডাইনোসরের পাশে সাঁতার কাটত—এটা বলা ঠিক নয়। কিন্তু একই পৃথিবীর পুরোনো ইতিহাসের অংশ—এ কথা বলা যায় নিশ্চিন্তে। মহাশোলের শরীর দেখলেও একটু ‘প্রাচীন’ মনে হয়। বড় বড় আঁশ, শক্তপোক্ত গঠন, আর লম্বা দেহ—সব মিলিয়ে এটাকে অন্য মাছ থেকে আলাদা করে দেয়, যেন নদীর ভেতরের কোনো পুরোনো যোদ্ধা।
মহাশোল: নদীর ‘দানব’
মহাশোল কিন্তু ছোটখাটো মাছ নয়, একেবারে দানব বলা যায়! বড় হলে ২০-৩০ কেজি পর্যন্ত ওজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি। ভাবতে পারো? তোমার পুরো স্কুলব্যাগের চেয়ে ভারী একটা মাছ! এ কারণেই অনেক জায়গায় একে ‘নদীর রাজা’ বলা হয়। বিশেষ করে ভারত, নেপাল বা ভুটানের পাহাড়ি নদীতে মহাশোল ধরার জন্য আলাদা রোমাঞ্চ আছে। একে ধরা মানে শুধু মাছ ধরা নয়—একটা চ্যালেঞ্জ জেতা। কারণ, এই মাছ খুব শক্তিশালী। হুক লাগলে সহজে ধরা দেয় না। উল্টো জেলের সঙ্গে লড়াই করে। তাই এটি ‘গেম ফিশ’ হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয়।
বাংলাদেশের নদী আর মহাশোলের গল্প
বাংলাদেশেও একসময় মহাশোল ছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের নদী আর উত্তরাঞ্চলের কিছু স্রোতস্বিনী নদীতে। আর একটা মজার ব্যাপার হলো এই মাছ আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিশেষ করে নেত্রকোনার বিরিশিরি অঞ্চলের পাহাড়ি ঝরনা ও নদীতে মাঝেমধ্যে মহাশোল পাওয়া যায়। সেখানকার ঠান্ডা, পরিষ্কার পানিতে এরা কোনোভাবে টিকে আছে। এই বিরিশিরি থেকেই কখনো কখনো বাজারে চলে আসে মহাশোল। ঢাকার কিছু বাজারে, বিশেষ করে অভিজাত বা বিশেষ মাছের দোকানে, মাঝেমধ্যে দেখা যায় এই মাছ। আর সেখানেও একটা নাম খুব শোনা যায়—‘লাল পাখনা মহাশোল’। এই ধরন দেখতে একটু আলাদা। পাখনায় লালচে আভা থাকে, যা একে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব দেখা এখন খুবই বিরল। একে বলা যায় ‘ভাগ্য থাকলে দেখা মেলে’ এমন মাছ।
এখন নেই কেন?
এটাই সবচেয়ে কষ্টের জায়গা। বাংলাদেশে এখন মহাশোল প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। অনেকেই তো নামটাই শোনেনি! কেন হারিয়ে গেল? প্রথম কারণ—নদীর পরিবর্তন। আমরা নদীকে যেমন খুশি তেমন বদলে ফেলছি। বাঁধ দিচ্ছি, ভরাট করছি, স্রোত বদলে দিচ্ছি। কিন্তু মহাশোলের বাঁচার জন্য দরকার ছিল স্বাভাবিক, মুক্ত নদী। দ্বিতীয় কারণ—দূষণ। কারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক—সব মিলে নদীর পানি আর আগের মতো নেই। তৃতীয় কারণ—অতিরিক্ত মাছ ধরা। ছোট মাছ, বড় মাছ—সবই ধরা হচ্ছে। ফলে মহাশোল ঠিকমতো বড় হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মহাশোল প্রজননের সময় উজানে যেতে চায়। কিন্তু নদীতে বাঁধ থাকলে সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন নতুন প্রজন্মই তৈরি হতে পারে না।
অন্য দেশে কী হচ্ছে?
মজার ব্যাপার হলো, দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশ মহাশোলকে বাঁচাতে বেশ সিরিয়াস। ভারতে কিছু নদীতে এটাকে সংরক্ষিত মাছ ঘোষণা করা হয়েছে। নেপালে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই নদীর একটা অংশ রক্ষা করে, যেখানে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। ফলে সেখানে মহাশোল আবার বাড়ছে। বাংলাদেশেও যদি এমন উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে হয়তো আবার এই মাছ ফিরে আসতে পারে।
‘ডাইনোসরের যুগ’—কতটা সত্যি?
এখন আসি আসল প্রশ্নে। মহাশোল কি সত্যিই ডাইনোসরের যুগের মাছ? সোজা উত্তর—পুরোপুরি নয়। কিন্তু এর মধ্যে একটা সুন্দর সত্য আছে। এই মাছ এমন এক বংশের অংশ, যার ইতিহাস অনেক পুরোনো। পৃথিবীর বহু পরিবর্তন—বরফ যুগ, জলবায়ুর বদল—সব পেরিয়ে তারা টিকে আছে। মানে আমরা যখন মহাশোলের কথা বলি, তখন আসলে পৃথিবীর অনেক পুরোনো এক গল্পের কথা বলি।
যদি আবার ফিরে আসে...
ভাবো তো, কয়েক বছর পর তুমি কোনো পাহাড়ি নদীর ধারে গেলে, আর কেউ বলল—‘এই নদীতে মহাশোল আছে।’ আর হয়তো বিরিশিরির মতো জায়গা থেকে আবার ঢাকার বাজারে আসছে সেই লাল পাখনা মহাশোল। কেমন লাগবে? এটা শুধু একটা মাছ ফিরে আসা না। এটা হবে আমাদের নদী আবার সুস্থ হওয়ার লক্ষণ। আমাদের প্রকৃতি আবার একটু ঠিক হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। মহাশোল তাই শুধু একটা মাছ নয়, এটি একটা স্মৃতি, একটা সতর্কবার্তা, আর একটু আশা—সব একসঙ্গে। হয়তো আমরা ঠিকভাবে যত্ন নিলে একদিন আবার বাংলাদেশের নদীতে সেই ‘পুরোনো দিনের’ মাছটা ফিরে আসবে। আর তখন ডাইনোসরের গল্পটা আর শুধু বইয়ে থাকবে না, নদীর পানিতেও একঝলক দেখা যাবে।



