বিএডিসির বীজে প্রতারণা: এক জমিতে তিন রকম ধান, চাষিদের সর্বনাশ
বিএডিসির বীজে প্রতারণা: এক জমিতে তিন রকম ধান

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) নির্ধারিত পরিবেশকের কাছ থেকে কেনা ভিত্তিবীজ ‘ব্রি ধান–৮৮’ চাষ করে রাজশাহীর পবা উপজেলার চাষিরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। একই জমিতে তিন রকমের ধান হয়েছে, যা দেখে চাষিরা হতবাক।

এক খেতে তিন জাতের ধান

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের নতুন কসবা গ্রামের মাঠে দেখা যায়, একই জমিতে তিন রকমের ধান। একটি জাতের ধান পেকে নাড়ার সঙ্গে লুটিয়ে পড়েছে, আরেকটি সদ্য পেকেছে এবং গাছ দাঁড়িয়ে আছে, অন্যটির শিষ বেরিয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে সবুজ ধানের খেত, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, সবুজ ধানের মধ্যে আগে-পরে আরও দুই জাতের ধান পেকেছে।

চাষি মোর্শেদ আলী (৪০) চার বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করেছেন। তাঁর জমিতেও একই অবস্থা। তিনি বলেন, ‘পাইটের (শ্রমিকের) কাছে গেলছুনু। ওরা বুইলছে এই ধান কাটতে পাইরবে না। এবার ধানের আশা আমার একদম নাই। গত বছর আমি সাড়ে ২৭ মণ হারে এই ধানের ফলন পাইচি। আমার দেখাদেখি এবার মাঠের অনেকেই করেছে। ওরা আমাক বিশ্বাস করে। আমি যে ধান লাগাই, অন্য চাষিরাও সেই ধানই করে। এবার আমার সঙ্গে ওহারেও সর্বনাশ হয়্যা গেলছে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বীজের দাম ও ক্ষতি

এই বীজ সরকারিভাবে ৭২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে। বাড়তি চাহিদার কারণে নির্ধারিত পরিবেশকদের কাছ থেকে চাষিরা ৭৬ টাকা কেজি দরে কিনেছেন। এক বিঘার জন্য পাঁচ কেজি বীজ প্রয়োজন।

পবা উপজেলার মুরারিপুর গ্রামের চাষি মাসুদ রানা (৩৩) তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তাঁর খেতেও একই অবস্থা। তিনি বলেন, ‘আমি শ্যাষ হয়্যা গেলছি। ভাই, আপনারা একটু কিছু করেন।’ এবার সার ও পানির দাম বেশি থাকায় তাঁর ৩৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, যা তিনি ধার করে জোগাড় করেছেন।

পরিবেশকের বক্তব্য

হরিপুর ইউনিয়নের ডিলার আনারুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ২০ জন চাষির কাছে এই বীজ বিক্রি করেছেন। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি সব চাষির সই নিয়ে বিএডিসির উপপরিচালকের কাছে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিএডিসির ব্যাখ্যা

বিএডিসি রাজশাহীর উপপরিচালক এ কে এম গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘দু–একজন আমার কাছে এসেছেন। আমি পবা উপজেলার হরিপুর মাঠে গিয়েছি। তবে আমি দাবি করি, যে মাঠগুলো দেখেছি, তাতে দুই রকম ধান ছিল। বিষয়টি ঢাকায় আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রধান কার্যালয়ে জানিয়েছি।’ তিনি জানান, এ রকম ঘটনা রাজশাহী ছাড়া আরও দু-এক জায়গায় হয়েছে। সেখানে তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত চলছে। তবে রাজশাহীতে এখনো তদন্ত কমিটি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রাজশাহীতে যতটুকু দেখেছি, ব্রি ধান–৯২–এর সঙ্গে ব্রি ধান–৮৮ মিশে গেছে। ভিত্তিবীজে এ রকম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে কোথায় যে এই দুই রকমের ধান মিশে গেছে, সেটি আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না।’

চাষিদের প্রতিক্রিয়া

চাষিরা বলছেন, তাঁদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। তাঁরা বিএডিসির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। মোর্শেদ আলী বলেন, ‘আমি একাধিকবার বিএডিসির অফিসে গিয়েছি। কোনো সুরাহা হয়নি।’

এদিকে, বিএডিসি বলছে, তদন্ত চলছে। তবে চাষিরা আশঙ্কা করছেন, তাঁদের ক্ষতি পূরণ হবে কি না।