কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জেলার ১৩টি উপজেলায় অন্তত ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা।
উপজেলা ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা উপজেলায়। সেখানে ১১ হাজার ৫০টি পরিবারের ৩ হাজার ২৬১ হেক্টর জমি তলিয়ে গিয়ে ৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অষ্টগ্রামে ৯ হাজার ১৫০টি পরিবারের ২ হাজার ৭০৩ হেক্টর জমিতে ৬২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, তাড়াইলে ১ হাজার ২২৪ হেক্টরে ২৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, নিকলীতে ৯২৩ হেক্টরে ২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং করিমগঞ্জে ৮৩০ হেক্টরে ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
অন্যান্য উপজেলার মধ্যে মিঠামইনে ৬৯০ হেক্টরে ১৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, কটিয়াদীতে ৫৮৫ হেক্টরে ১৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, সদর উপজেলায় ২৭৫ হেক্টরে ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ভৈরবে ২১১ হেক্টরে ৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, বাজিতপুরে ১৬২ হেক্টরে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, কুলিয়ারচরে ৬৫ হেক্টরে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং হোসেনপুরে ৪৭ হেক্টরে ৩ কোটি ১০ লাখ টাকার ফসলহানি হয়েছে।
কৃষকদের দাবি ও সমস্যা
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন, সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত ক্ষতি অনেক বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক জরিপে পূর্ণাঙ্গ তথ্য উঠে আসেনি। তারা আরও অভিযোগ করেন, হাওড়ে অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, পলি জমে নদ-নদী ও খাল-বিলের নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং স্লুইসগেট অকেজো হওয়ায় পানি নামতে পারেনি, ফলে নজিরবিহীন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
ইটনার দীঘির পাড় গ্রামের কৃষক দাউদ সালেক মিয়া জানান, তিনি ৮ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ একরের ফসল কেটে ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি সাড়ে ৪ একরের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বোরো ফসলই তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। এবার মহাজনি ও ব্যাংক ঋণ শোধের কোনো সুযোগ থাকল না।
তিনি আরও জানান, আগে অকাল বন্যায় ফসল ডুবে গেলে নিম্ন আয়ের লোকজন বা শ্রমিকদের ডুবন্ত ফসল কেটে এক ভাগ তাদের দিয়ে দুই ভাগ নিজেরা নিতেন। কিন্তু এবার ‘তে ভাগা’ বা ‘নয়ন ভাগা’তেও কেউ আগ্রহী নয়, কারণ কাঁচা ফসল ৪০০ টাকা মণেও বিক্রি হচ্ছে না। অন্য কাজে গেলে তারা তিন-চারগুণ বেশি টাকা পাচ্ছেন।
বড় হাটি গ্রামের কৃষি শ্রমিক কালা মিয়াও একই কথা জানিয়েছেন। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও ডিজেল সংকটের কারণে হার্ভেস্টার মেশিন ও শ্রমিক দিয়ে ধান কাটা এবং ট্রাক, নৌকা, টমটমে ফসল পরিবহণেও বাড়তি খরচ ও বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, ৪ মে পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। তবে হিসাব শেষ হতে না হতেই আরও প্রায় দেড় হাজার হেক্টর বোরো ধান নতুন করে পানিতে তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।



