২০০০ সালের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন বড় সাজ্জাদ হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলী। সম্প্রতি চট্টগ্রামে ৯ মাস আগে সংঘটিত এক চাঁদাবাজির ঘটনায় আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ এবং তাঁর ছয় সহযোগীকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
গত বছরের ২০ জুলাই প্রথম দফায় সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বিদেশি একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে বালু ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনুসকে ফোন করে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না পেলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ইউনুস চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ২৩ জুলাই আবারও ফোন করে হুমকি দিয়ে সাজ্জাদ বলেন, ‘ঠিক আছে, টাকা নিয়ে কবরে যাবি।’ দ্বিতীয় দফা হুমকির পর ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের চান্দগাঁওয়ের মোহরা এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলে করে এসে ইউনুসের বাড়িতে হানা দেন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে ইউনুস আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে মৃত ভেবে চলে যাওয়ার সময় অস্ত্রধারীদের একজন বলেন, ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।’ সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। তাঁর হাঁটু, কোমর, পাসহ শরীরের চারটি স্থানে গুলি লাগে এবং চারটি দাঁত পড়ে যায়।
মামলা ও অভিযোগপত্র
ঘটনার পরদিন ইউনুসের স্ত্রী খোদেজা বেগম বাদী হয়ে সাজ্জাদ আলীসহ নয়জনের নাম উল্লেখ করে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন। পুলিশ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে তাঁদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়। গত সোমবার চট্টগ্রাম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় চান্দগাঁও থানা-পুলিশ। এতে বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ ছাড়াও আসামি করা হয়েছে তাঁর সহযোগী মোহাম্মদ হাসান, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মোহাম্মদ রায়হান, ফাহমী নিজামী চৌধুরী, নুরুল হক ও কামাল উদ্দিন ওরফে বালু কামালকে। মোহাম্মদ আলম ওরফে ববি ও এরশাদ হোসেনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ১২ জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আজিজুল হক বলেন, ‘৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে বালু ব্যবসায়ী ইউনুসকে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দফায় দফায় ফোন করে হুমকি দেন। শেষে তাঁর সহযোগীদের দিয়ে গুলি করেন। তদন্তে বিদেশে থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে চাঁদা দাবি ও হুমকির তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনায় জড়িত সাজ্জাদের সহযোগীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা গেছে।’
ভুক্তভোগীর বক্তব্য
গুলিতে আহত বালু ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনুস এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। তিনি বলেন, ‘এখনো ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারি না। ভয় কাজ করে, কখন আবার কী হয়ে যায়। সাজ্জাদ বিদেশে বসে দেশে এসব করার সাহস কীভাবে পায়। তার সহযোগীরা এত অস্ত্র কোথা থেকে পায়। তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।’ তবে অভিযোগের বিষয়ে সাজ্জাদ আলী বলেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে চাঁদা চাইনি। ইউনুসকেও চিনি না।’
সাজ্জাদের অপরাধজগৎ
ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। চাঁদা না পেলেই গুলি ছুড়ছেন তাঁর অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকেন। সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলি করার অভিযোগ ওঠে সাজ্জাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এর আগে গত ২ জানুয়ারি ওই বাসায় গুলি করেছিলেন সন্ত্রাসীরা। এরপরও চাঁদা না পেয়ে দ্বিতীয় দফায় গুলি করা হয়। এর ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে ওই ব্যবসায়ীকে একটি বার্তা দেন সাজ্জাদ, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। গুলিতে বাসার জানালার কাচ ভেঙে গিয়েছিল, দরজায়ও গুলি লাগে। পুলিশ পাহারার মধ্যেই বাসাটিতে আবারও গুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজন আসামিকে ধরলেও অস্ত্রধারী রায়হান ও মোবারককে এখনো ধরতে পারেনি।
সিসিটিভি ফুটেজ
ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুরের বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চার ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে বাসার কাছে আসেন এবং বাসাটি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকেন। পুলিশ বিশ্লেষণ করে জানায়, চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন সাবমেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়েন।
কে এই সাজ্জাদ
নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান অপরাধজগতে পরিচিত হন ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় খালাস পান। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়, যার নেতৃত্ব দেন সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন। এর পর থেকেই বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন তাঁর বাহিনী। ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও খালাস পান সাজ্জাদ। শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে ওঠে তাঁর বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যান, সরোয়ার দল ছাড়েন। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী গণসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার জন্য বড় সাজ্জাদকে দায়ী করা হয়।
পুলিশের তথ্য
পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। তিনি ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছেন, যেখানে তাঁর নাম সাজ্জাদ খান। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ২টি জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তাঁরা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিপক্ষকে খুন করেন, কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হন। ২০১৫ সাল থেকে দেশে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন, যিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে।



