কোমরসমান পানিতে ডুবে থাকা ধান কাটছেন কৃষক
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা। হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার ভানুরা বিল হাওর। হালকা মেঘলা আকাশ, চারদিকে শুধু পানি আর পানি। মাঝহাওরে ছোট একটা ডিঙিনৌকা। কাছে যেতেই দেখা গেল, এক কিশোর ও মাঝবয়সী এক ব্যক্তি কোমরসমান পানিতে ডুবে থাকা ধান খুঁজে খুঁজে কেটে নৌকায় তুলছেন। যেন তাঁরা ডুবে যাওয়া স্বপ্নের শেষ অংশটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
এই দুজন বাবা ছেলে—মুহিদ মিয়া (৫৩) ও সায়েম (১৭)। বাড়ি বানিয়াচংয়ের ইকরাম গ্রামে। মুহিদ মিয়া জানান, অনেক আশা নিয়ে বাড়ির পাশের হাওরে ৫ একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। এ জন্য তাঁকে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির অপ্রত্যাশিত আচরণে এখন সেই সবুজ স্বপ্ন ডুবে আছে কয়েক ফুট পানির নিচে।
কাটা স্বপ্নও অনিশ্চয়তায়
ধানগাছ শুকনো থাকলে কাটার পরপরই তা মাড়াই করা যায়। কিন্তু হাওরে ডুবে থাকা ধানের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। আগে কাটা ধানগাছ কিছুটা শুকাতে হবে, তারপর মাড়াই শুরু করতে হবে। মুহিদ মিয়া ও তাঁর ছেলে নৌকায় করে এনে কাটা ধানগাছগুলো হবিগঞ্জ-ইকরাম সড়কের পাশে একটু উঁচু জায়গায় স্তূপ করে রাখছেন।
ছেলে সায়েম বলল, এই ভেজা ধান রাখার মতো শুকনা জায়গা তাঁদের নেই। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে রাখতে হচ্ছে। এখন রোদ না থাকায় শুকানোরও সুযোগ পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়ছে। সায়েমের জিজ্ঞাসা ‘আমরা অখন বাড়িত কিতা লইয়া ফিরতাম?’
সব জমির ধান পানির নিচে উল্লেখ করে ক্লান্ত কণ্ঠে মুহিদ মিয়া বলছিলেন, ‘ঋণ করা ট্যাকা ক্যামনে হুশতাম (শোধ), বুঝতাছি না।’ চার মেয়ে ও তিন ছেলেসহ মুহিদ মিয়ার ৯ সদস্যের পরিবার। সংসারের মূল উপার্জনের ভার এখনো তাঁর কাঁধে।
ক্ষুধার্ত সন্তানের কথা বলতে চোখে পানি
কথা বলার একপর্যায়ে মুহিদ মিয়া বললেন, ‘বিকালে ঘর গিয়া কিতা খাইতাম, ওই চিন্তাত আছি।’ তিনি জানান, ভোরে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ছোট ছেলে শুভকে (১০) খাবারের জন্য কাঁদতে দেখেছেন। ঘরে তেমন কিছু ছিল না। তাঁর স্ত্রী বাধ্য হয়ে আলু সিদ্ধ করে ছেলেকে খাইয়েছেন। এই কথা বলতে বলতে মুহিদ মিয়ার চোখে পানি চলে আসে।
মুহিদ মিয়ার মতো এমন অসংখ্য কৃষকের একই চিত্র এখন হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পানি, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওরের ঢল, আর সুরমা-কুশিয়ারা নদীর উপচে পড়া পানিতে জেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ, বাহুবল ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার অনেক এলাকা এখন পানির নিচে। জেলার বৃহত্তম গুঙ্গিয়াজুরী হাওরও ডুবে আছে একইভাবে।
কৃষি কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, জেলার প্রায় ৪৫ শতাংশ জমির বোরো ধান এখন পানির নিচে। ডুবে গেছে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার হেক্টর জমির ফসল। মুহিদ মিয়ার ভাষ্য, সরকার যদি সাহায্য না করে, এ বছর তাঁর মতো অনেক কৃষককে পথে বসে যেতে হবে।



