সিংড়া-আত্রাই সড়কের জোড়মল্লিকা সেতুর নিচে আত্রাই নদীর পানিপ্রবাহ ঠেকাতে মাটির বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। চলনবিলের বিস্তীর্ণ ধানখেতে এবার দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এসেছে। টানা দুই দিনের বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা আত্রাই নদীর পানি নাটোরের সিংড়া উপজেলার পাঁচটি খাল দিয়ে চলনবিলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। দ্রুত পানি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে বিলের প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিজেই। পানি নিয়ন্ত্রণে রাত–দিন কাজ করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয় কৃষকেরা।
বৃষ্টি ও পানির প্রবাহ
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে দুই দিন ধরে সিংড়ার চলনবিল এলাকায় টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এতে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার ধানের জমি ইতিমধ্যে ডুবতে শুরু করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক আত্রাই নদীর পানি নিয়ে। উজান (উত্তর ভারত) থেকে নেমে আসা এই নদীর পানি সিংড়ার জোড়মল্লিকা, সারদানগর–হুলহুলিয়া, কতুয়াবাড়ি, রাখালগাছা ও পৌর শ্মশানঘাট খাল দিয়ে চলনবিলে ঢুকতে শুরু করেছে।
প্রশাসনের উদ্যোগ
প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় কৃষকেরা এসব খালের মুখে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করছেন। তবে নদীর পানির উচ্চতা বাড়তে থাকলে এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এসব বাঁধ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ চলনবিলের ধান পানিতে তলিয়ে যেতে পারে।
ধান চাষের পরিস্থিতি
চলতি বছর সিংড়ায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির ধান এখনো মাঠে আছে। এসব ধান কাটতে আরও ১৫ থেকে ২০ দিন সময় প্রয়োজন।
স্থানীয়দের বক্তব্য
স্থানীয় লোকজন জানান, গতকাল শুক্রবার রাত থেকে সিংড়া–আত্রাই সড়কের জোড়মল্লিকা সেতুর নিচ দিয়ে আত্রাই নদীর পানি জোড়মল্লিকা মাঠে ঢুকতে শুরু করে। খবর পেয়ে কৃষকেরা সারা রাত জেগে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে সেতুর নিচে মাটির বাঁধ দেন। বাঁধের কারণে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে শুরু করেছে। পানি ঢুকে পড়লে এখানকার ২৫০ থেকে ৩০০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাবে।
সারদানগর–হুলহুলিয়া খাল দিয়ে আত্রাই নদীর পানি চলনবিলের মূল অংশে প্রবেশ করতে শুরু করে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কৃষি কর্মকর্তা গতকাল সেখানে ছুটে যান। তাঁদের আর্থিক সহযোগিতায় স্থানীয় লোকজন মাটির বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করেন। তবে বাঁধ যেকোনো সময় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকেরা।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কতুয়াবাড়ি, উত্তর দমদমা জোলারবাতা স্লুইসগেট এলাকা। স্লুইসগেটের একটি অংশ ভাঙা থাকায় আত্রাই নদীর পানি সেখান দিয়ে বিলে প্রবেশ করছে। স্থানীয় লোকজন বালুর বস্তা দিয়ে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া রাখালগাছা ও পৌর শ্মশানঘাট খালের মুখ দিয়েও নদীর পানি বিলে ঢুকতে শুরু করেছে।
কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ এসব ঝুঁকির কথা নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, বিলে উৎপাদিত ধানের দুই-তৃতীয়াংশ এখনো কাটা বাকি। এ অবস্থায় উজানের আগাম বৃষ্টির পানি এবং গত দুই দিনের স্থানীয় বৃষ্টির পানি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই ধান কাটতে যন্ত্র (হারভেস্টর) ব্যবহার করছেন না। যন্ত্রে কাটা ধানের মূল্য অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এই অনীহা। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা হারভেস্টরের মালিকদের মোবাইল নম্বর দিয়ে কৃষকদের যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছেন। আশা করা যায়, আজ শনিবার থেকে তাঁরা ধান কাটতে যন্ত্র ব্যবহার করবেন। পাশাপাশি মাটির বাঁধ দিতে সব ধরনের প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।



