সুনামগঞ্জের হাওরে রোদ ফিরলেও শঙ্কা কাটেনি কৃষকদের, ধান তোলায় অনিশ্চয়তা
হাওরে রোদ ফিরলেও শঙ্কা কাটেনি, ধান তোলায় অনিশ্চয়তা

হাওরে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে নিয়ে আসছেন কৃষকেরা। গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ঝাওয়ার হাওরে এই দৃশ্য দেখা গেছে। কয়েক দিনের বৃষ্টি শেষে হঠাৎ রোদ উঠলে কিষান-কিষানিরা দলে দলে বেরিয়ে পড়েন ঘরের বাইরে। কেউ পানিতে তলিয়ে থাকা ধান কাটতে নেমে পড়েন, কেউ মাড়াইয়ে ব্যস্ত হন, আবার কেউ আগে থেকে স্তূপ করে রাখা ধান শুকানোর চেষ্টা করেন।

তবে এই রোদে শঙ্কা কাটেনি হাওরবাসী কৃষকদের। যেকোনো সময় আবার ঝুম বৃষ্টি নামতে পারে। তাই হাওরে থাকা বাকি ধান তোলায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, আকাশে মেঘ আছে, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। শুক্রবারও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে, তাই শঙ্কা রয়ে গেছে।

কৃষক সুনু মিয়া (৫০) বলেন, 'যা যাইবার তো গেছেগি। এই রোডটা থাকলে বাকি ধান টেনেটুনে তোলা যাইব। ঘরের কাটা ধানও কিছুটা রক্ষা অইব।' হাওরপারের ফিরিজপুর গ্রামের এই কৃষকের ১১ বিঘা জমির মধ্যে সাত বিঘার ধান আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি চার বিঘার ধান এখন কাটার চেষ্টা করছেন তিনি। এ জন্য দ্বাদশ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই ছেলেকে নিয়ে এসেছেন ধান কাটতে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধান শুকানোর চেষ্টা

হাওরপাড়ে পলিথিনের চটের ওপর ভেজা ধান মেলে দিয়েছেন জোছনা বেগম (৪৫)। তিনি জানান, এই ধান তিন দিন আগের মাড়াই করা। ধানে একধরনের ভ্যাপসা গন্ধ ধরে গেছে। এখন এই ধান শুকানোর পর কতটা কাজ দেবে, সেটি বুঝতে পারছেন না। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরগুলোর ৫১ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এবার জেলার ১৩৭টি হাওরে বোরো আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। তবে অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাওরের কৃষকেরা সাধারণত কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটেন। তবে এবার পানি জমে থাকায় অনেক হাওরে যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা যায়নি। এছাড়া হাতে ধান কাটা শ্রমিকের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে।

ক্ষতির হিসাব নিয়ে দ্বিমত

কৃষি বিভাগ প্রাথমিকভাবে হিসাব করে বলছে, সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, এটি চূড়ান্ত নয়, পূর্ণাঙ্গ ক্ষতি নির্ধারণে সময় লাগবে।

তবে কৃষি বিভাগের এই হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন হাওর আন্দোলনের সদস্যরা। সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, 'সুনামগঞ্জের এমন কোনো হাওর নাই, যেটিতে ফসলের ক্ষতি হয়নি। আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ৫০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।'

কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার অবস্থা

গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের নিকলী, করিমগঞ্জ ও বাজিতপুরের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, চার দিন পর সেখানেও কৃষক-শ্রমিকেরা ধান কাটছেন। ট্রাকসহ ছোট-বড় যানবাহনে করে কাটা ধান নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাড়াইয়ের জন্য। খলায় স্তূপ করে রাখা ধান কৃষকেরা রোদে নাড়ছেন। অনেককে ভেজা খড় সড়ক ও খোলা মাঠে ছড়িয়ে শুকাতেও দেখা গেছে।

বৃষ্টি না হওয়ায় একই দৃশ্য ছিল নেত্রকোনায়। তবে সেখানেও রয়েছে শঙ্কা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় বলছে, কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি ও মদন উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ৮ হাজার ৯৫ হেক্টর খেতের পাকা ধান তলিয়ে গেছে। বেশ কিছু ফসল রক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে। গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, কংস নদ, উব্দাখালি ও মগরা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

'হাওর বাঁচাও আন্দোলন' সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, হাওরের কৃষকদের ইতিমধ্যে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। আরও যদি বৃষ্টি হয়, পাহাড়ি ঢল নামে, তাহলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাটির বাঁধ বাকি ফসলও রক্ষা করতে পারবে না।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, হাওরে এখনো বন্যার পানি আসেনি। যে পানিতে ধান ডুবেছে, তা বৃষ্টির জমাটবদ্ধ পানি। হাওরের বিভিন্ন নালা, খালসহ নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই।