নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকরা তাদের ফসল ঘরে তোলার আগেই পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ছয়দুর রহমানের কষ্ট
৬২ বছর বয়সী দিনমজুর ছয়দুর রহমান ভাগ্য বদলাতে এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাত্র ১ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। কিন্তু ধান কেটে ঘরে তোলার আগেই বৃষ্টিতে ডুবে গেছে তার ধানখেত। বুধবার দিনভর তিনি মদন উপজেলার উচিতপুর হাওড়ে বুক পানি থেকে ধান কেটে তুলেছেন এবং ছেলেকে নিয়ে ত্রিপলে করে টেনে এনেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যুগান্তরের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানান, ঋণ শোধের কোনো পথ দেখছেন না।
মুখলেছ মিয়ার দুশ্চিন্তা
একই এলাকার কৃষক মুখলেছ মিয়া বলেন, বৃষ্টিতে ধান নষ্ট না হলে জমি থেকেই তার পরিবারের ৬ মাসের চালের ব্যবস্থা হয়ে যেত। এখন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটারও উপায় নেই। একজন শ্রমিক আনতে প্রতিদিন ১ হাজার ৮শ টাকা খরচ হয়, যা ৩ মণের ধানের টাকার সমান। শ্রমিকও মিলছে না। তিনি ঋণ শোধ ও খাবার নিয়ে চিন্তিত।
আব্দুল জলিলের হতাশা
কলমাকান্দার উদয়পুর গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে একাই ধান কাটছিলেন। তিনি জানান, এই ধান সাধারণত শেষে কাটা হয়, কিন্তু এবার আগেই পানি এসে তলিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ধান কাটার শ্রমিকও নাই। হাওড়ের পানিতে মেশিনও চলে না। এখনো এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারিনি। বাচ্চারা কী খাইব?’
মফিজ মিয়ার সর্বনাশ
কলমাকান্দার বড়কাপন এলাকার কৃষক মফিজ মিয়া বুধবার সন্ধ্যায় তার প্রায় এক একর ধানখেত ভেসে থাকতে দেখেছিলেন। ধান কাটার জন্য শ্রমিক ঠিক করে রেখেছিলেন; কিন্তু সকালে দেখেন সব খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তার দেড় একর জমির বেশির ভাগ তলিয়ে গেছে, বাকি অংশও শ্রমিক সংকটে কাটাতে পারছেন না।
ওয়াসিম মিয়ার ক্ষতি
খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক ওয়াসিম মিয়া বলেন, নন্দের পেটনা হাওড়ে তার প্রায় ৬০ একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। আর দুই সপ্তাহ সময় দিলেই কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারতেন। হাওড়ে এখনো অর্ধেক ধান কাটা হয়নি। ফসলে বিপর্যয় নেমে এসেছে।
পানি বাড়ছে, ক্ষতির শঙ্কা
নেত্রকোনায় ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কংস নদ, সোমেশ্বরী ও মগড়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খালিয়াজুরীর ধনু, কলমাকান্দার উব্দাখালি ও মহাদেও নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। অব্যাহত বৃষ্টিতে কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী ও মদন উপজেলার বেশ কয়েকটি হাওরে নতুন করে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধানখেত তলিয়ে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। হাওড় অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন। সোমবার বিকাল পর্যন্ত ৫৯ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, এখনো পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজারের বেশি হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ইউএনওরা মাঠে আছেন এবং সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে জিওব্যাগ ফেলার দরকার, সেখানে তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পানি বাড়লে ঝুঁকি বাড়বে, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।



