মাছ শিকারের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ। নৌকাগুলো পাড়ে প্রস্তত করে রেখেছে জেলেরা। ‘তেল পাইলে নদীত যামু, নাইলে নাই; নাইলে হেই দেনা কইরা দিন চালাইতে অইবো’—আজ বৃহস্পতিবার সকালে কথাগুলো বলেন ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের জেলে ইউসুফ মাঝি (৫৪)। তাঁর মতো অনেক জেলের দাবি, সরকারি ভর্তুকিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হোক।
জাটকা সংরক্ষণ অভিযান শেষ
জাটকা সংরক্ষণ অভিযান শেষে আজ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে মেঘনা-তেতুলিয়াসহ দেশের পাঁচটি অভয়াশ্রমে মাছ ধরা শুরু হওয়ার কথা। তবে মাছ ধরা শুরু হলেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কারণে অধিকাংশ জেলে এখনো ঘাটে বসে আছেন। ইউসুফ মাঝির নৌকায় ছয়জন মাঝিমাল্লা রয়েছেন। কোনো সহায়তা না পেয়ে গত দুই মাস তাঁরা মানবেতর অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের দুর্দশা
মার্চ ও এপ্রিল—এ দুই মাস ভোলার নদীগুলোয় অভয়াশ্রম সৃষ্টির লক্ষ্যে জাল ফেলা নিষিদ্ধ ছিল। এ সময় জেলার ১৯০ কিলোমিটার নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। দুই যুগ ধরে এ কার্যক্রম চালু রয়েছে। এতে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লেও অভাব দূর হয়নি। মহাজনের দাদন, এনজিওর কিস্তি ও দারিদ্র্যের চাপে কিছু জেলে আইন উপেক্ষা করে জাটকাসহ ছোট মাছ শিকার করেছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের মতে, এ ধরনের জেলের সংখ্যা খুবই কম। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ জেলে নিষেধাজ্ঞা মেনে ডাঙায় থেকে কষ্টে দিন পার করেছেন।
তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকট
জেলেরা জানান, ঋণের চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি। রাজাপুরের জেলে আবুল কালাম মাঝি (৪৫) জানান, নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই তিনি জাল-নৌকা গুছিয়ে তীরে উঠেছেন। তাঁর নৌকায় ১৪ জন মাঝিমাল্লা থাকলেও মাত্র ২ জন জেলে কার্ডধারী। তাঁরা ৪০ কেজি করে মোট ৮০ কেজি চাল পেয়েছেন, যেখানে পাওয়ার কথা ছিল ১৬০ কেজি করে মোট ৩২০ কেজি। নিষেধাজ্ঞার সময়ে দিনমজুরি করে কোনোভাবে সংসার চালালেও মাছ ধরতে যাননি। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও তেলের উচ্চ মূল্য ও সংকটের কারণে নদীতে নামতে পারছেন না। তিনি বলেন, এখন চাইলেই নদীতে নামা যাচ্ছে না। দোকানদার নগদ অর্থ ছাড়া তেল দিচ্ছেন না, আবার চাহিদামতো তেলও পাওয়া যাচ্ছে না।
আড়তদারদের বক্তব্য
সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের চডারমাথা মাছঘাটের মৎস্য আড়তদার শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন, দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকার পর জেলেরা ঋণ শোধের আশায় নদীতে নামতে চাইলেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। আগাম নগদ অর্থ দিলেই কেবল তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা–ও লিটারপ্রতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা দরে। এতে অনেক জেলের পক্ষেই তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
লালমোহন উপজেলার বাত্তিরখাল মাছঘাটে জেলে মামুন মাঝি ও মৎস্য আড়তদার মো. ঝিকু জানান, জেলেরা জাল-নৌকা নামিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আলকাতরা দিয়ে নৌকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে তেল কিনতে পারলে শুক্রবার নদীতে নামার আশা করছেন তাঁরা। বাত্তিরখালে ৪ লিটার ডিজেলের দাম ৭০০ টাকা হলেও সেটিও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের দাবি, জেলেদের জন্য ন্যায্যমূল্যে তেলের ব্যবস্থা করা হোক।
চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচরের মৎস্য আড়তদার শাহে আলম ফরাজি বলেন, টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল পেলেই জেলেরা নদীতে নামবেন।
জেলে সমিতির দাবি
সদর উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী ও জেলে সমিতির সভাপতি এরশাদ আলীসহ একাধিক জেলে বলেন, বাজারে তেলের দাম যা–ই হোক, জেলেদের নদীর পাড়ে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দিয়ে এক লিটার ডিজেল কিনতে হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত জেলেদের কমপক্ষে ন্যায্যমূল্যে তেল দেওয়া; ভর্তুকি দিলে তা আরও সহায়ক হবে।
মৎস্য কর্মকর্তার মতামত
সদর উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, দীর্ঘ দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা নদীতে নামবেন। এ সময় জ্বালানি তেলের সংকট বা দাম বেশি হওয়া দুঃখজনক। তবে তাঁর মতে, ডিজেলের কোনো সংকট নেই। জেলেদের ভর্তুকির দাবির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারেননি। তিনি বলেন, একসময় মৎস্যখামারিরা কোনো ভর্তুকি পেতেন না; দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এখন তাঁরা ২০ শতাংশ কমিশন বা ভর্তুকি পাচ্ছেন। হয়তো সরকার চাইলে জেলেরাও তা পেতে পারেন।
জেলা প্রশাসনের আশ্বাস
ভোলা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বেলাল হোসেন বলেন, ভোলায় তেলের কোনো সংকট নেই। তারপরও জেলেরা যাতে তেল পায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



