দেশের বিভিন্ন জেলায় টানা ঝড়-বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানি বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি করছে। ফসল কাটার মৌসুমে এ ক্ষতি ধান উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য শঙ্কা তৈরি করেছে।
দিনাজপুরে তিন দিনের বৃষ্টিতে বোরো ধানের ক্ষতি
দিনাজপুরের হিলি ও হাকিমপুর উপজেলায় টানা তিন দিনের বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নিচু জমিতে পানি জমে ধানের শীষ ডুবে গেছে, আর ঝড়ে পাকা ধান মাটিতে লুটে পড়েছে।
হাকিমপুরের কৃষকরা জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই ফসল কাটার কথা ছিল, কিন্তু টানা বৃষ্টিতে তা পিছিয়ে গেছে। এতে শস্যদানা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, কৃষকদের জমি থেকে পানি নিষ্কাশন ও লুটে পড়া গাছ বেঁধে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাকা ধান দ্রুত কাটারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
নেত্রকোনায় সোমেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি
ভারতের মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির কারণে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় সোমেশ্বরী নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে গেছে। বুধবার সকাল থেকে বিজয়পুর সীমান্ত দিয়ে পানি প্রবেশ করে, সারাদিন পানি বাড়তে থাকে। এতে তেরিবাজার ঘাট-শিবগঞ্জ ঘাট ও বিরিশিরি-দক্ষিণ ভবানীপুর এলাকায় কাঠের সেতু ডুবে ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সেতু জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার কায়সার কামালের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছিল।
রিকশাচালক রমিজ উদ্দিন বলেন, সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নদী পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। আগে কাঠের সেতু দিয়ে নিরাপদে পার হওয়া যেত, এখন নৌকা নির্ভর হতে হচ্ছে, যা শিক্ষার্থী ও যাত্রীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বুধবার বিকেল ৩টায় সোমেশ্বরী নদীর বিজয়পুর পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৫.১১ মিটার নিচে এবং দুর্গাপুর পয়েন্টে ৩.৫৩ মিটার নিচে ছিল। কংশ নদীতেও পানি বিপদসীমার ৩.৯৯ মিটার নিচে ছিল।
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিপা বিশ্বাস বলেন, এ উপজেলায় ১৭ হাজার ৬০৮ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। তিনি কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার আহ্বান জানান।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, বন্যা পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি, তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের ধান কাটার কাজ ত্বরান্বিত করতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও করণীয়
আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে, যা স্থানীয় বন্যার ঝুঁকি তৈরি করবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কম্বাইন হারভেস্টার ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত ধান কাটার কাজ চলছে। কৃষকদের পাকা ধান দ্রুত কাটা, জমি থেকে পানি নিষ্কাশন, লুটে পড়া গাছ বেঁধে দেওয়া ও যান্ত্রিক হারভেস্টার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসলের ক্ষতির মাত্রা ও দেশের চাল সরবরাহে এর প্রভাব আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করবে। একজন কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ফসল কাটার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে স্থানীয় ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা কৃষকের আয় ও আঞ্চলিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে প্রভাবিত করবে।



