আগুনমুখা নদীর বুকে সংগ্রাম: নৌকাতেই জীবন, নৌকাতেই জীবিকা
আগুনমুখা নদীর বুকে সংগ্রাম: নৌকাতেই জীবন ও জীবিকা

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় আগুনমুখা নদীর তীরে বোয়ালিয়া স্পিডবোট ঘাট এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক পরিবার নৌকায় বসবাস করে। তাদের প্রধান জীবিকা ছোট নৌকায় নদীতে মাছ ধরা। এসব পরিবারের ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু।

এক যুগের বেশি সময় ধরে সংগ্রাম

শাবানা আক্তার (৩০) এক যুগের বেশি সময় ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার পরিবারে শুধু ১৫ বছর বয়সী এক ছেলে আছে। তাকে নিয়ে প্রতিদিন আগুনমুখা নদীতে মাছ ধরতে যান তিনি। বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা করে নৌকা চালিয়ে জীবিকা অর্জন করেন।

সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত

জেলার অন্যান্য জেলেরা সরকারি সহায়তা পেলেও এই নারী জেলেরা তালিকায় নাম না থাকায় বঞ্চিত। মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র, হোল্ডিং নম্বর ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়নপত্র না থাকায় তারা সরকারি সুবিধা পান না। তবে বিশেষ বিবেচনায় তাদের তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, 'এসব জেলে ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সরকারি সুবিধার আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নদীতেই বসবাস, নদীতেই জীবিকা

আগুনমুখা নদী পটুয়াখালী-গলাচিপা ও রাঙ্গাবালী উপজেলার যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। বঙ্গোপসাগরের মোহনা হওয়ায় বছরজুড়ে নদীটি উত্তাল থাকে। নদীর তীরে জেগে ওঠা চরে ছিন্নমূল মানুষের জীবনসংগ্রাম। সেখানে কোনো কাঁচা-পাকা ঘর নেই, সবাই নৌকাতেই বসবাস করে।

আলেয়া বেগমের আক্ষেপ

আট বছর আগে ঋণগ্রস্ত হয়ে নিজ গ্রাম ছেড়ে বোয়ালিয়া ঘাটে এসেছেন আলেয়া বেগম (৩২)। তিনি বলেন, 'ছয়-সাত বছর ধরে নদীতে মাছ ধরি, বাজারে বেচি। থাকার জন্য একটি ঘর তুলতে পারিনি। পুরুষ জেলেদের সরকারি তালিকায় নাম আছে, কিন্তু আমার নামটি আজও তালিকায় ওঠেনি।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিশুদেরও নদীতে কাজ

নদীতেই বেড়ে উঠছে শিশুরা। রেহেনা বেগমের (২৪) কোলে ছয় বছর বয়সী শিশু সোহাগ। তিনি বলেন, 'নদীতে অনেক বাতাস বইছে, নৌকা নিয়ে টেকা যায় না। তেলের দাম বেশি, ঘরে চাল নেই।' ১০ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর হোসেন মা-বাবার সঙ্গে মাছ ধরে। সে বলে, 'ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরি। স্কুলে যাই না।'

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত

১৪ বছর বয়সী রুমান সরদার চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। এখন বরফকলে শ্রমিকের কাজ করে। সে বলে, 'স্কুল গেলে তো খাওন পাওয়া যায় না। ঘরে ভাত না থাকলে স্কুল দিয়া কী করমু?' ১৫ বছর বয়সী রুবেল হাওলাদার অন্যের নৌকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। তার মা ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর থেকে সে নদীতে মাছ ধরে।

সরকারি স্বীকৃতির অপেক্ষা

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, 'আগুনমুখা নদীর বোয়ালিয়া প্রান্তে প্রায় অর্ধশত এবং রাঙ্গাবালী প্রান্তে ১৭৫ জন নারী মাছ ধরা পেশায় জড়িত। তারা নৌকায় বসবাস করায় হোল্ডিং নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে জটিলতা হয়। তবে বিশেষ বিবেচনায় তাদের তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'