পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি, কৃষকদের দুশ্চিন্তা
পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি, কৃষক দুশ্চিন্তায়

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো ধানের খেত। পাকা ধান ডুবে যেতে দেখে অনেক কৃষক আজ ভোর থেকেই ধান কাটতে নেমে পড়েছেন। দীঘিনালার হর্টিকালচার সেন্টার এলাকায় হাঁটুপানিতে ডুবে গেছে চারপাশের ফসলি জমি।

ধান কাটতে ব্যস্ত কৃষক

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে পাহাড়ি ঢল নামতে থাকে। আজ বুধবারও দিনভর টানা বৃষ্টি হওয়ায় পানি বেড়েছে। পানিতে অধিকাংশ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। তার মধ্যে যতটুকু পারেন, খেতের ফসল বাঁচাতে চেষ্টা করছিলেন কৃষকেরা। দীঘিনালার হর্টিকালচার সেন্টারের সামনে পানিতে ভেজা ধান কেটে আঁটি করে খেতের পাশে উঁচু জমিতে রাখছিলেন কৃষক মো. হানিফ। তিনি বলেন, ‘২৫ হাজার টাকায় এক একর জমি বর্গা লইসি। নিজে দিন–রাত খাইটা চাষ করসি। ছোখের সামনে পাকা ধান ডুইব্যা গেল। অল্প কিছু ধান কাটতে পারসি। এখন না খাইয়া থাকতে হইব আমাগো।’

জুড়ে ক্ষতি

টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কেবল দীঘিনালা নয়, পুরো খাগড়াছড়ি জেলার কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দীঘিনালা, মাটিরাঙা ও মহালছড়ি উপজেলায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে প্রায় ২২১ হেক্টর বোরো পাকা ধান, ৬৩ হেক্টর সবজি ও ৫৪৮ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আম ঝরে পড়ায় আমচাষিরাও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জেলার বোরো মৌসুমের প্রায় ৮০ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে পেকে গিয়েছিল। এমন অবস্থায় হঠাৎ ভারী বর্ষণ ও ঢলের পানিতে অনেক খেত তলিয়ে গেছে। দীঘিনালার নিম্নাঞ্চলে বহু কৃষকের ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

কৃষকের হাহাকার

মো. হানিফের মতোই খেতের ফসল ডুবে গেছে মো. মকবুল হোসেনের। তিনি বলেন, ‘পাঁচ একর জমিতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধান কাটার আগেই সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। আমার এ ধানক্ষেত ছাড়া আর কোনো আয়রোজগার নেই। প্রতিবছর কিছু ধান বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাই। এখন কী খাব আর কীভাবে চলব, ভাবছি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষক অনিমেষ চাকমা বলেন, ‘সাধারণত এপ্রিল মাসে কখনো পাহাড়ে এমন ঢল নামে না। এবারের বৃষ্টিতে সেটা হলো। রাতেরও আমরা ধারণা করিনি যে ফসল তলিয়ে যাবে। বৃষ্টিতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব ধান ডুবে গেছে। লোকও পাচ্ছি না পানির নিচ থেকে কাটার জন্য। এখন তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য

দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি বেশি হয়েছে। উপজেলায় প্রায় ৩২৫ হেক্টর ফলবাগান, ১২৫ হেক্টর বোরো ধান ও ১৫ হেক্টর সবজিখেত ডুবে গেছে।

আমের ক্ষতি

প্রবল বৃষ্টির পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে বয়ে গেছে কালবৈশাখী। ঝরে পড়েছে আম ও কাঁঠালের মতো ফল। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়ি গ্রামের আমচাষি মংশিতু চৌধুরী ৩৫ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও ঝড়ে এক দিনেই তাঁর বাগানের প্রায় দুই হাজার কেজি আম ঝরে পড়েছে। গত বছরের মতো এবারও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।

স্থানীয় আরেক আমচাষি রাজু চাকমা বলেন, তাঁর ১২ একরের বাগানে আম্রপালি ও বারি-৪সহ বিভিন্ন জাতের আম ছিল, কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে অধিকাংশ আম ঝরে গেছে।

ক্ষতিপূরণের আশ্বাস

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে তা ঢাকায় পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।