‘গত কয়েক দিন শ্রমিক সংকটের কারণে পাকা ধানগুলো কাটতে পারিনি। অল্প কিছু কেটেছি। এখন বেশিরভাগ কাটার আগেই পানির নিচে চলে গেলো। এত কষ্টের ধান চোখের সামনেই তলিয়ে গেলো। কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারছি না। এখনও পানি আসছে। মনে হয় না এসব ধান আর রক্ষা করতে পারব।’
গত তিন দিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কষ্টের কথা জানান অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম। তার মতো অবস্থা হাওরাঞ্চলের সব কৃষকের। বেশিরভাগ ধান পানিতে ডুবে যাওয়ায় হাহাকার করছেন কৃষকরা।
হাওরে ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণ
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিস্তীর্ণ হাওরে চার দিন আগেও যেখানে ধান বাতাসে দুলছিল, কেউ কেউ কাটছিলেন। এর মধ্যে রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার হাওরের বোরো ধান ডুবে গেছে। অনবরত নদী উপচে পানি ঢুকছে হাওরে। এসব ধান পচে যাওয়ার শঙ্কায় আছেন কৃষকরা।
কৃষকরা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তলিয়ে আছে অষ্টগ্রাম হাওরের কয়েক হাজার হেক্টর বোরো জমি। এখনও অনবরত নদী উপচে পানি ঢুকছে হাওরে। গত দুদিনের বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা বন্ধ পুরো হাওরে। এখন কোমর-সমান পানি। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে এসব ধান না কাটলে সব পচে নষ্ট হবে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ক্ষতির পরিমাণ
নিকলী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দুদিন এমন ভারী বৃষ্টি থাকবে। বৃষ্টির ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। কখন বৃষ্টি থামবে, আর কখন ধান কাটবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সব কৃষক। সঙ্গে আছে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি। সবমিলিয়ে কৃষকদের মাঝে এখন হাহাকার।
কৃষকদের বক্তব্য
পানিতে তলিয়ে গেছে অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কৃষক ফুল মিয়ার সারা বছরের স্বপ্ন। তিনি এবার ধানের আবাদ করেছিলেন ১০ একর জমিতে। সব ধান এখন পানির নিচে। যেগুলো কয়েকদিন পর ঘরে তোলার কথা ছিল, যা দিয়ে সারা বছর সংসার চালানোর কথা; সেই ধান হারিয়ে এখন চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন এই কৃষক। তিনি বলেন, ‘জমিতে বুক সমান পানি। তার নিচে আমার কষ্টের ধান। জানি না অন্তত কিছু রক্ষা করতে পারবো কিনা। এত বড় আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবো না। কি খেয়ে বাঁচবো।’
তার মতো সংসার চালানোর হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট হয়ে গেছে অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলামেরও। তিনি বলেন, ‘দেড় একর জমিতে এবার ব্রি-৮৮ ধান চাষ করেছিলাম। ধান পেকে যাওয়ায় কাটতেও শুরু করেছিলাম। ৪০ শতাংশ কাটা শেষ করেছি। এরই মধ্যে পানি সব ডুবিয়ে দিলো। বেশিরভাগ ধান পানির নিচে চলে গেছে। এখন কিছু কেটে নিয়ে যাচ্ছি। হয়তো রোদ পেলে শুকিয়ে খাওয়া যাবে। কিন্তু বাজারে বিক্রির কোনো উপায় নেই। ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলাম। সব পানিতে চলে গেলো। সংসার চালানোর ধানও উঠবে না। আর ঋণের বোঝা মাথার ওপর। কীভাবে এসব সামলাবো, বুঝে উঠতে পারছি না।’
বেলাল ভূঁইয়া এ বছর তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। কষ্টের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই হাওরে আমার মতো কমবেশি সব কৃষকের হাজার হাজার একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এত বড় ক্ষতির মুখে আর পড়িনি। কীভাবে পুরো বছরের খাবার জুটবে, আর কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবো তাও জানি না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের জমি তলিয়ে যাওয়ার কারণ হলো শিবপুর নদী। এ ছাড়াও আশপাশে আরও কিছু নদী আছে, সেগুলোতে যদি হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়া হয়, তাহলে হয়তো আমরা ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ থেকে বাঁচতে পারবো। নয়তো প্রতি বছর কষ্টের ফসল হারাতে হারাতে আমরা না খেয়ে মারা যাব।’
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
কী পরিমাণ ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সে হিসাব এখনও করা হয়নি। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ করা ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ৫০ শতাংশ কাটা শেষ হয়েছে। এবার আগেভাগেই কৃষকদের ৮০ ভাগ ধান পাকলেই কাটার পরামর্শ দিয়েছিল কৃষি বিভাগ। এখন ৫০ শতাংশ ধান আধাপাকা অবস্থায় কাটতে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু কৃষকরা চেষ্টা করলেও তাতেও আর কোনো লাভ হচ্ছে না। অধিকাংশ ডুবে গেছে। আবার বৃষ্টির কারণে কাটাও যাচ্ছে না। আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কারও কিছুই করার থাকে না। তবুও যদি আবহাওয়া একটু ভালো হয়, ডুবে যাওয়া ধান কাটা যাবে।’



