প্রকৌশলী ফারদিনের সফল আঙুর চাষ, ৫০ শতাংশ জমিতে বাগান
প্রকৌশলী ফারদিনের সফল আঙুর চাষ, বাগান ৫০ শতাংশ জমিতে

প্রকৌশলী ফারদিন আহমেদ (৩৩) কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আঙুর চাষে সাফল্য অর্জন করেছেন। নিজ গ্রামে প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে আঙুরবাগান তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর বাগানে দেশি-বিদেশি নানা জাতের আঙুর রয়েছে। সাফল্য দেখে তিনি আরও দেড় একর (১৫০ শতাংশ) জমিতে আঙুর চাষের পরিকল্পনা নিয়েছেন।

গ্রামের বাড়িতে আঙুর চাষের সূচনা

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার কুটি পাচুরিয়া গ্রামে ফারদিনের বাড়ি। তিনি জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে আঙুর চাষের পাশাপাশি গবেষণাও করছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘গ্রেপ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাগ্রো অ্যান্ড রিসার্চ’। ফল বিক্রির পাশাপাশি কাটিং, কলম ও চারা বিক্রি করে তিনি লাভবান হয়েছেন।

শিক্ষা ও পেশাজীবন

ফারদিন স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে রাজধানীতে ‘ফারবট রোবোটিকস’ নামের একটি কোচিং সেন্টার চালু করেন। সেখানে রোবট তৈরি করে আলোচনায় আসেন এবং বরিশালের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবোটিকস বিষয়ে শিক্ষকতাও করেছেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রোবোটিকস প্রশিক্ষণ দেন। এর ফাঁকে নিজ গ্রামে আঙুর চাষ করছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শখ থেকে বাণিজ্যিক চাষ

প্রথমে শখ করে বাড়ির উঠানে একটি আঙুরগাছ রোপণ করেছিলেন ফারদিন। প্রথম ফলন খাওয়ার উপযোগী না হলেও ইউটিউব দেখে আঙুর চাষে আগ্রহী হন। পরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০২৫ সালের মে মাসের শেষে বাবার ৫০ শতাংশ জমিতে বাগান শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে দেশি-বিদেশি ২০৪ জাতের প্রায় ৪৮০টি গাছ সংগ্রহ করে রোপণ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাগানের বৈচিত্র্য

কুটি পাচুরিয়া গ্রামের আঞ্চলিক সড়কের কাছে ফারদিনের আঙুরবাগান। চারপাশ ঘেরা বাগানের সামনে বড় সাইনবোর্ডে লেখা ‘গ্রেপ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাগ্রো অ্যান্ড রিসার্চ’। বাগানে জাপানের রুবি রোমান, ফ্যান্টাসি সিডলেস, ল্যাম্বরগিনি, ব্ল্যাক ম্যাজিক, ফুজি গ্লোরি, লোরাস, ন্যারো সিডলেস, ইউক্রেনের ভ্যালেজ, রাশিয়ার বাইকোনুর, গ্রিন লং, অটুমান রয়েল, অস্ট্রেলিয়ান কিংসহ ইতালি, চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের নানা জাতের আঙুর রয়েছে।

উৎপাদন ও বিক্রি

গাছগুলো প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু জালের মাচায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাগানের এক পাশে সারি সারি চারা বিক্রির জন্য রাখা। আগ্রহীরা সরাসরি কিংবা কুরিয়ারের মাধ্যমে চারা কিনতে পারছেন। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা বাগান দেখতে আসছেন; কেউ কেউ দূরদূরান্ত থেকেও আসছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাও বাগানটি পরিদর্শন করেছেন।

ফারদিন আহমেদ বলেন, কৃষি বিষয়ে আগে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ২০২০ সালে শখ করে আঙুরগাছ লাগানো থেকেই আগ্রহের শুরু। দেশে আঙুর হয় না, এমন ধারণা থেকে অনেকেই শুরুতে হাসাহাসি করতেন। তবে সাফল্য পাওয়ায় তাঁরা এখন উৎসাহ ও সাহস দিচ্ছেন। আঙুর লাভজনক ফসল। ফলের পাশাপাশি কলম ও চারা বিক্রি করেও আয় করা যায়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মাল্টা বা কমলার ক্ষেত্রে তিন থেকে চার বছর পর ফল পাওয়া গেলেও আঙুর লাগানোর পরের বছরই ফলন আসে জানিয়ে ফারদিন বলেন, ভবিষ্যতে বাগান ঘিরে একটি রিসোর্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে তাঁর।

ফারদিন জানান, বাগানে ২০৪ জাতের ৪৮০টির বেশি গাছ সংগ্রহ করেছেন, যার অধিকাংশেই ফলন এসেছে। কিছু জাত বীজবিহীন। সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১৩ হাজার টাকা মূল্যের চারা আছে। বাগানে প্রায় ১৩ হাজার চারা উৎপাদন করা হয়েছে, ইতিমধ্যে প্রায় ৪ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে বাগানে প্রায় দুই-তিন লাখ টাকার আঙুর রয়েছে। মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টাকা, যার বড় অংশ প্রথম বছরেই উঠে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

প্রায় ১০ মাস ধরে বাগানটি দেখাশোনার কাজ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা শরিফ ইসলাম। তিনি বলেন, প্রথম বছরেই ভালো ফলন হয়েছে। ফারদিনের উদ্যোগে তাঁরা গর্বিত। এতে তাঁদের কর্মসংস্থানও হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তার মতামত

গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার বলেন, তরুণ উদ্যোক্তা ফারদিন আহমেদ কেমিক্যাল ছাড়াই উচ্চফলনশীল আঙুর চাষ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তিনি বিভিন্ন জাত নিয়ে কাজ করছেন, যা সম্ভাবনাময়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাঁকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।