অতিবৃষ্টি ও ঢলে সুনামগঞ্জে ধান নষ্ট, ভাঙছে বাঁধ
অতিবৃষ্টি ও ঢলে সুনামগঞ্জে ধান নষ্ট, ভাঙছে বাঁধ

সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর ও নদীতে পানি বেড়ে কৃষকের চোখের সামনে জমির ধান তলিয়ে যাচ্ছে। পানির চাপে দুই উপজেলায় দুটি বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে।

ধান কাটা অর্ধেকের বেশি বাকি

কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরের ৪৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। বোরো আবাদের অর্ধেক জমির ধান কাটা এখনো বাকি। সবকিছু এখন প্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে অনেকটা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাওরের কৃষকেরা। বৈরী আবহাওয়া, হাওরে পানির চাপ, বজ্রপাতের আতঙ্ক এবং ধান কাটা শ্রমিকের সংকটসহ নানা কারণে সংকট গভীর হয়েছে।

সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের ভারী বৃষ্টিতে অনেক হাওরের জমির ধান তলিয়ে গেছে। আবার পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেকের শুকানোর খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাঁধ ভাঙার ঘটনা

হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে গেছে। দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধও পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। বাঁধ দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাভুক্ত নয়; স্থানীয় লোকজন সংস্কার করেছিলেন। দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণের বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢুকছিল। সকাল থেকে পাউবো কর্মকর্তারা ওই বাঁধে অবস্থান করছিলেন। বাঁধটির কাজ গত বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পানি বৃদ্ধি ও পূর্বাভাস

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। আগামী দুই দিনও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে উজানের পাহাড়ি ঢল নামবে। হাওরের জন্য আগামী দুই দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; এরপর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

ফসলের ক্ষতি

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এবার ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। হাওরে বোরো ধান কাটায় কৃষকেরা হারভেস্টর মেশিনের ওপর বেশি নির্ভর করেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাওরে পানি থাকায় অনেক স্থানে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। বৃষ্টিও বড় সমস্যা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকেরা মাঠে আছেন এবং ধান তোলার চেষ্টা করছেন। তাঁরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এখন সবকিছুই আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে।

কৃষকদের বক্তব্য

জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরপাড়ের দাসনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরণ দাস (৬০) জানান, গতকাল দিনেও জমিতে পাকা ধান রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাতের বৃষ্টিতে সর্বনাশ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার সকালে এসে দেখেন, জমির সব ধান তলিয়ে গেছে। ১৬ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র চার বিঘা জমির ধান তুলতে পেরেছেন।

দিরাই উপজেলার কাইমা গ্রামের কুদরত পাশা বলেন, তাদের এলাকায় হাওরের খলায় অনেক কৃষকের ধান রাখা ছিল। সকালে উঠে অনেকে দেখেন সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। একই অবস্থার কথা জানান জামালগঞ্জের আহসানপুর এলাকার কৃষক আবদুস সালাম। জামালগঞ্জের হালির হাওর, সদর উপজেলার দেখার হাওর, দিরাইয়ের পাগনার হাওর, শাল্লার ছায়ার হাওর, শান্তিগঞ্জের খাই হাওর, পাখিমারা হাওর ও বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওরে বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

কৃষকেরা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে অনেক হাওরে আগেই জলাবদ্ধতা ছিল। অনেক ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন ভারী বৃষ্টি হচ্ছে; ধান কাটা-মাড়াই ও শুকানোর সুবিধা নেই। এর মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকট রয়েছে। ধানের মায়ায় বন্যা, ভারী বৃষ্টি আর বজ্রপাতের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে হাওরে যাচ্ছেন তাঁরা, কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না।

আন্দোলন ও প্রশাসনের অবস্থান

সুনামগঞ্জ হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, পরিস্থিতি ভালো নয়। চোখের সামনে অনেক কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে; কৃষকেরা কাঁদছেন। অনেক কৃষক আধা ভাগিতেও ধান কাটা শ্রমিক পাচ্ছেন না। হাওরে কৃষকের অসহায়ত্ব ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়; সত্যিকার অর্থে কৃষকের পাশে কেউ নেই।

অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জের হাওর-নদীতে পানি বাড়ছে। হাওরের বিভিন্ন ফসল রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেকোনো সময় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে ফসলহানি হতে পারে। তাই সব বাঁধে পাহারার ব্যবস্থা করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান।

সুনামগঞ্জে হাওরের ফসল রক্ষায় এবার ১৪৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে পাউবো। সংস্থাটির সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলো মাটির তৈরি। টানা বৃষ্টিতে এসব বাঁধের মাটি দুর্বল হয়ে আছে। উজানের ব্যাপক ঢল নামলে অনেক বাঁধ চাপ সামলাতে পারবে না। তাই সব বাঁধেই তাঁরা নজর রাখছেন।