ভোর চারটা। চারপাশ তখনো আধো আঁধারে ঢাকা। দূরে কোথাও মোরগ ডাকে, কোথাও ঘুমভাঙা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। ঠিক তখন ঘুম ভাঙে সমাপ্তি মণ্ডলের (৩৬)। চুলায় আগুন জ্বেলে শুরু হয় দিনের প্রথম আয়োজন—রান্নাবান্না। হাঁড়িতে ভাত চড়ে, কড়াইয়ে তরকারি ফুটতে থাকে। এরই ফাঁকে একে একে গুছিয়ে নেন সংসারের ছোট-বড় সব কাজ।
ভোরের আলো ফোটার পরপরই সমাপ্তি বেরিয়ে পড়েন শহরের উদ্দেশে। সন্তানেরা তখনো ঘুমে। সাড়ে ছয়টার মধ্যে স্বামীর ভ্যানে চড়ে পৌঁছে যান শহরে। খুলনা নগরের দোলখোলা এলাকার একটুকরা ফুটপাতই তাঁর প্রতিদিনের ঠিকানা। এই ভোর থেকে শুরু হওয়া নিরবচ্ছিন্ন ছুটে চলাই বটিয়াঘাটা উপজেলার হোগলবুনিয়া গ্রামের এই নারীর প্রতিদিনের জীবন, প্রতিদিনের জীবিকার সংগ্রাম।
গৃহিণী থেকে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি
একসময় সমাপ্তি ছিলেন শুধু একজন গৃহিণী। রূপসার শিয়ালি গ্রাম ছেড়ে বিয়ের পর নতুন সংসারে ঢুকে পড়েছিলেন চিরচেনা ব্যস্ততায়। দিন গড়াত, কাজ বাড়ত, কিন্তু আয় থেকে যেত সেই আগের মতোই। সেই টানাপোড়েনের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর ভূমিকা। আজ তিনি সংসারের প্রধান ভরসা। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে।
রোববার দুপুরে দোলখোলার ফুটপাতে যখন সমাপ্তির সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তাঁর বেচাকেনা শেষের পথে। সামনে পড়ে আছে দুটি কুমড়া, কয়েক ছড়া কলা আর কিছু ডিম। তবু ক্রেতার আনাগোনা থামে না। বেশির ভাগই পরিচিত মুখ। কেউ বলেন, ‘দুটো ভালো পাকা বেল এনে দিয়ো।’ কেউ আবার গাছপাকা পেঁপের কথা বলেন। সমাপ্তি হাসিমুখে সবার কথা শোনেন, হিসাব কষেন, কাকে কীভাবে জোগাড় করে দেওয়া যায়।
প্রেমের টানে ঘর ছাড়া, সংসারের টানে লড়াই
কথা প্রসঙ্গে সমাপ্তি ফিরে গেলেন অতীতে। লাজুক হাসিমুখে বললেন, ‘এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি তখন। ফলও বের হয়নি। সেই সময়ই প্রেম করে ঘর ছেড়েছিলাম।’ সেই পথচলা সহজ ছিল না। ছিল না কোনো নিশ্চিন্ত আশ্রয়, আয়ের ভরসা। তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্নটাও চাপা পড়ে যায় সংসারের টানে। স্বামী সবুজ মণ্ডল তখন খেতখামারে কাজ করতেন, কখনো পাওয়ার টিলার চালাতেন। পরে কাজের খোঁজে চলে যান নারায়ণগঞ্জের একটি শিপইয়ার্ডে। কোনো রকমে চলছিল সংসার। কিন্তু করোনার ধাক্কায় থমকে যায় সেই পথও। ফিরে আসতে হয় গ্রামে। গ্রামে ফিরে সবুজ নতুন করে শুরু করেন ভ্যান চালানো আর খেতখামারের কাজ। কিন্তু বছর দুয়েক আগে ধানমাড়াইয়ের সময় তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। চিকিৎসায় খরচ হয়, শরীরেও পড়ে প্রভাব। আগের মতো আর ভ্যান টানতে পারেন না।
একদিকে আয় কমে আসা, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকা—সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তা পেয়ে বসে সমাপ্তিকে। কীভাবে সংসারে হাত বাড়ানো যায়, সেই ভাবনা থেকেই খোঁজ শুরু। সমাপ্তি বলেন, ‘দিনকাল যা পড়ছে, একার আয়ে সংসার সামলানো যায় না। ছেলেমেয়েরাও বড় হচ্ছে। ভাবলাম, কিছু একটা করতেই হবে।’ এক আত্মীয়ের কাছ থেকে পান নতুন পথের সন্ধান। গ্রাম থেকে ফল-সবজি সংগ্রহ করে শহরে বিক্রি করা। সেই পরামর্শই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতি।
গ্রামের পণ্য শহরে: এক সেতুবন্ধন
এখন প্রতিদিনই তিনি বসেন ফুটপাতে—কাঁচা কলা, পাকা কলা, সফেদা, বেল, ফুল, ঝিঙে, টমেটো, শাকপাতা, দেশি মুরগির ডিম, মুরগিসহ গ্রামে যা কিছু পাওয়া যায়, তা-ই তাঁর পসরা। সকালে বাড়িতে খাওয়া হয় না সমাপ্তির। কোনো দিন মুড়ি, কোনো দিন দুটো শিঙাড়া খেয়ে নেন। এদিকে স্বামী সবুজ তাঁকে নামিয়ে দিয়ে ফিরে যান। কখনো ভ্যান চালান, কখনো খেতখামারে কাজ করেন, আবার সময় পেলে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেন। তবে এখন ভ্যান চালানোর কাজেও নতুন বাধা হয়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত ভ্যানে চার্জ দেওয়া যায় না। অনেক সময় কাজেও নামতে পারেন না সবুজ। এতে সংসারের আয় আরও কমেছে।
সমাপ্তি বেচাবিক্রি শেষ হলে নিজের মতো করে বাড়ি ফেরেন। কখনো দুপুর সাড়ে ১২টায়, কখনো ২টায়। বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম, তারপর আবার নতুন ব্যস্ততা। গ্রামের মানুষ বিকেলে এসে দিয়ে যান তাঁদের উৎপাদিত ফল-সবজি। কেউ আসতে না পারলে সমাপ্তিই চলে যান তাঁদের বাড়ি। সমাপ্তি বলেন, ‘একদিন গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে মালামাল সংগ্রহ করি, পরদিন সেগুলো শহরে এনে বিক্রি করি। বিক্রি শেষে বিকেলে তারা এসে টাকা নিয়ে যায়। বিশ্বাসের ওপরই পুরো বিষয়টা চলে।’
স্বপ্ন ও অর্জন
কথা বলতে বলতে মুখে একরকম তৃপ্তির ছাপ ফুটে ওঠে সমাপ্তির। তিনি বলেন, ‘এই কাজটা শুরু করার পর আমাদের সংসারে যেমন একটু সচ্ছলতা এসেছে, তেমনি গ্রামের মানুষেরও উপকার হচ্ছে। আগে অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে যেত। ধরেন, কারও গাছে দুইটা বেল ধরেছে—ওগুলো নিয়ে বাজারে যাওয়া সম্ভব হতো না। আবার কারও বাড়িতে খাওয়ার পর এক ছড়া কলা বেশি থেকে গেল—সেটাও আর বিক্রি করা যেত না। এখন তারা সেগুলো আমার কাছে দিয়ে যায়। আমি বিক্রি করে দিই, তারা দাম পেয়ে যায়। সবারই লাভ হচ্ছে।’
দিন শেষে রাত নামে, কিন্তু কাজ শেষ হয় না সমাপ্তির। রান্না সেরে পণ্য গোছাতে গোছাতে কখনো রাত ১১টা, কখনো ১২টা পেরিয়ে যায়। আবার ভোর চারটায় নতুন দিনের ডাক। আয় যে খুব বেশি, তা না। কোনো দিন ৩০০ টাকা, কোনো দিন ৫০০ টাকা, কখনো একটু বেশি। মাসে গড়ে ১৫ হাজার টাকার মতো। তবু এই আয়ের ভেতরেই রয়েছে স্বস্তি। একসময় খড়ের ঘরে থাকা পরিবারটি এখন টিনের একটি ঘর তুলেছে। ব্যাংকে ছোট সঞ্চয়ও করছেন।
সমাপ্তি মৃদু হেসে বলেন, ‘এখন আগের চেয়ে ভালো আছি। নিজের আয় আছে, সংসারে হাত দিতে পারছি। একটা ভালো পাকা ঘর বানাতে চাই, একটা টিউবওয়েল বসাতে চাই। এই ব্যবসাটা চালিয়ে যেতে চাই। আর ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে চাই।’ বেচাকেনার ফাঁকে হঠাৎ বেজে ওঠে তাঁর মুঠোফোন। অপর পাশে স্বামী সবুজ মণ্ডল। কথা শেষে সমাপ্তি বলেন, ‘স্বামী জানতে চায়, আজ বেচাবিক্রি কেমন হলো, কখন ফিরব। লোকটা সংসারের সবার খোঁজ রাখে, আমাকে সাহায্য করে। সব মিলিয়ে ভালো আছি।’
প্রেমের টানে ঘর ছাড়া সেই কিশোরী আজ জীবনের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এক দৃঢ় নারীর প্রতিচ্ছবি। ভোরের অন্ধকার থেকে শুরু হওয়া তাঁর পথচলা দিন শেষে থামে একটুকরা আলোয়। ক্লান্তির ভেতরও যেখানে থাকে বেঁচে থাকার স্বস্তি। আর তাঁর ঝুড়িভর্তি ছোট ছোট পণ্য গ্রাম ও শহরের মধ্যে গড়ে তুলছে এক সম্পর্কের সেতু।



