আলুর পর বোরো চাষেও লোকসানে জয়পুরহাটের কৃষক
আলুর পর বোরো চাষেও লোকসানে জয়পুরহাটের কৃষক

জয়পুরহাটে আলুর পর এবার বোরো ধান চাষ করেও লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। বোরো ধান রোপণ, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, কীটনাশক প্রয়োগ এবং ধান পাকার পর কাটা ও মাড়াই কাজে তীব্র শ্রমিক সংকটসহ সামগ্রিক উৎপাদন খরচ অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় উৎপাদিত ধান বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে তাদের মাথায় হাত পড়ে গেছে।

আলু চাষের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় বোরো চাষ

আলু চাষে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা জয়পুরহাটের কৃষকরা আলুচাষ করে অধিকাংশ কৃষকই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তাই আশা ছিল, বোরো ধান চাষ করে আলু ফসলের সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার; কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। আলু ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া দূরের কথা, উৎপাদিত বোরো ধান বিক্রি করে তাদের বোরো ধান চাষের উৎপাদন খরচই উঠছে না। ফলে তাদের মাথায় হাত, হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। জেলার হাট-বাজারে বোরো ধানের দাম কিছুটা বাড়লেও সে অপেক্ষা বোরো ধান চাষের খরচ বেশি হওয়ায় পোষাচ্ছে না।

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান

সংশ্লিষ্ট কৃষকরা জানান, অন্যবারের চেয়ে এবার বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ে খরচ হয়েছে বেশি। তা ছাড়া বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচের খরচও বেড়েছে। সে কারণে বোরো চাষে লাভ নয়, বরং উল্টো প্রতি বিঘায় গড়ে তাদের ২-৩ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারগুলোতে প্রতি মণ শুকনো ব্রি-৯০ জাতের বোরো ধান ২ হাজার ৩শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর ব্রি-১৬ ও ব্রি-১৭ জাতের শুকনো ধান বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার টাকা মণ দরে; কিন্তু এবার বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এ দামে ধান বিক্রি করে তাদের পোষাচ্ছে না। ফলে লাভ তো নয়ই, উৎপাদন খরচ অর্থাৎ আসলই উঠছে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলু মৌসুমের লোকসান ও বোরো চাষের বাড়তি খরচ

তারা বলছেন, এবার (সম্প্রতি শেষ হওয়া আলু মৌসুমে) আলুচাষ করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ার পাশাপাশি অসময়ের বৃষ্টিতে আলু ফসল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের লোকসান গুনতে হয়। সেই লোকসান পোষাতে এবার তারা বেশি করে বোরোর চাষ করেছেন। এতে বিঘাপ্রতি তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা; কিন্তু এখন উৎপাদিত বোরো ধান বিক্রি করে সেই খরচ উঠছে না। প্রতি বিঘায় গড়ে উৎপাদন খরচ ৩০ হাজার টাকা হলেও এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে সর্বোচ্চ মিলছে ২৮ হাজার টাকা। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে কৃষকদের কমপক্ষে ২ হাজার টাকা ঘাটতি থাকছে অর্থাৎ লোকসান গুনতে হচ্ছে।

শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি এবার জ্বালানি তেলের সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের বেশি খরচ পড়েছে ধান কাটা-মাড়াইয়ে। ১ বিঘা জমির ধান কাটতেই খরচ হয়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা। আবার মাড়াইয়ে খরচ পড়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শ টাকা।

কৃষকদের বক্তব্য

এ ব্যাপারে জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার বেলগাড়ি গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মুনছুর রহমান বলেন, ৯ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আলু চাষ করে আমার ১ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এক বিঘা জমির বর্গা খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। লোকসান তুলতে শ্রমিক লাগিয়ে সেই জমিতেই আবার ব্রি-১৭ জাতের বোরো ধান চাষ করেছি। এক বিঘা জমির ধান কাটা ও মাড়াইয়ে খরচই পড়ছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচতো আছেই। বাজারে শুকনো ধানের দাম বেশি হলেও কাঁচা ধানের দাম কম। সে অনুযায়ী ধান বিক্রি করে আমাদের মুলধনই উঠছে না।

কালাই উপজেলা সদরের কৃষক মনোয়ার হোসেন জানান, এবার ৩০ বিঘা জমিতে ব্রি-১৭ জাতের ধান চাষ করেছি। কিন্তু সঙ্কটের কারণে এক বিঘা জমির ধান কাটতেই খরচ পড়ছে ৬ হাজার টাকা। আবার মাড়াই খরচতো আছেই। আশা ছিল ২৬ মণ হারে ফলন হবে। কিন্তু ফলন হয়েছে ২২ মণ হারে। এই ধান রোদে শুকালে আরও কমে যাবে। এতে বাজার মূল্যে ধান বিক্রি করে লাভ হবে না। কাটা-মাড়াই এবং সার বীজ ও সেচ খরচ বেশি না হলে বিঘাপ্রতি অন্তত ২ হাজার টাকা লাভ টিকত। তিনি বলেন, এমনিতেই এবার আলু চাষ করে মরে গেছি। আবার ধানেও লোকসান হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ বন্ধ করা ছাড়া আমাদের আর উপায় নেই।

কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদিকুল ইসলাম বলেন, এবার অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কৃষকরা বোরো ধান প্রক্রিয়াজাত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। পানির কারণে মাঠে হারভেষ্টর দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। ফলে মজুরি খরচ বেশি পড়ছে। আবার ধানের কাঙ্ক্ষিত দামও পাচ্ছে না কৃষকরা। এ অবস্থায় সরকারি খাদ্য গুদামে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার আহ্বান জানান তিনি।

বোরো ধান উৎপাদনের তথ্য

উল্লেখ্য, এবার জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৬৯ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে; যা থেকে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।