খাগড়াছড়িতে আমের বাম্পার ফলন, তবুও দামে হতাশ চাষিরা
খাগড়াছড়িতে আমের বাম্পার ফলন, তবুও দামে হতাশ চাষিরা

খাগড়াছড়িতে এবার ভালোই ফলন হয়েছে আম্রপালি আমের। তাই বিক্রি করে বেশি লাভ হবে—এমনটাই আশা করেছিলেন চাষিরা। তবে চাষিদের অভিযোগ, ফলন ভালো হলেও এবার বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। গত বছর যে দামে আম বিক্রি হয়েছিল, এবার মিলছে তার অর্ধেক। বর্তমান বাজারদরে বাগানের পরিচর্যা, শ্রমিকদের মজুরি আর সার-কীটনাশক বাবদ যে খরচ হয়েছে, তা–ও উঠে আসবে না বলে দাবি চাষিদের।

কমেছে দাম, বাড়ছে ক্ষতি

গত এক সপ্তাহ বাজারে মিলছে খাগড়াছড়ির আম্রপালি আম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাগড়াছড়ির পাইকারিতে এবার আকারভেদে আম্রপালি আম বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০-৫০ টাকায়। এর আগের বছর বিক্রি হয়েছিল ৬০ থেকে ১০০ টাকায়।

অনুকূল আবহাওয়া ও পাহাড়ের মাটির গুণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে খাগড়াছড়ি আম্রপালির ভালো ফলন হয়। মিষ্টি স্বাদ, সুন্দর রঙের কারণে খাগড়াছড়ির আম্রপালির ভালোই চাহিদা থাকে বাইরের জেলাগুলোয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা, দীঘিনালা ও মানিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা গেছে, গাছে পরিপক্ব আম ঝুলছে। বাগানে শ্রমিকেরা আম সংগ্রহে ব্যস্ত। সদর উপজেলার পেরাছড়া এলাকার একটি বাগানে কথা হয় আমচাষি রতনময় চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত বছর যে আম ঘরে বসে পাইকারিতে ৭০ টাকায় বিক্রি করেছি, এবার সেই আম ৫০ টাকায়ও বিক্রি করতে পারছি না। সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিচর্যার খরচ বেড়েছে। কিন্তু বাজারদর কমে যাওয়ায় লাভের আশা আর এবার করছি না।’

পানছড়ির নালকাটা এলাকার চাষি হীরাধন চাকমা বলেন, ‘আম উৎপাদনে সারা বছর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু মৌসুমে যদি ন্যায্যমূল্য না পাই, তাহলে এত কষ্টের কোনো মূল্য থাকে না। এখন খরচ ওঠানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পথে পথে টোল, আসছেন না পাইকারেরা

আমচাষিদের অভিযোগ, এ বছর বাইরের জেলার পাইকারি ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। সাধারণত প্রতিবছর ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা সরাসরি বাগানে এসে আম কিনে নিয়ে যান। এতে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ায় দামও ভালো পাওয়া যেত। কিন্তু এ বছর জেলায় বাইরের পাইকার আসছে খুবই কম।

চাষিরা জানান, পাইকার কম আসার অন্যতম কারণ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। পাহাড়ি জেলা হওয়ায় খাগড়াছড়ি থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে তুলনামূলক বেশি খরচ হয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি এবং পথে নানা ধরনের অতিরিক্ত খরচ পাইকারদের পাহাড় থেকে আম কিনে নিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমের বাজারে।

স্থানীয় ফল ব্যবসায়ী মো. মেহেদি হাসান, রবিউল ইসলাম ও আইয়ুব আলী বলেন, খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী বা দেশের বড় বাজারগুলোয় আম পরিবহনে যে খরচ হয়, তাতে লাভ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দূরের পাইকারেরা কম দামে আম কিনতে চান। আর সেই চাপ গিয়ে পড়ে উৎপাদনকারীদের ওপর।

জেলার ফল ব্যবসায়ী ও চাষিরা জানান, খাগড়াছড়ি থেকে অন্য জেলায় আম পরিবহনের সময় পৌরসভা ক্রেটপ্রতি (২০ থেকে ২২ কেজি) ১০ টাকা হারে টোল আদায় করে। ফলে দুই হাজার কেজি আমবাহী একটি পিকআপ ভ্যানের টোল দিতে হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এরপর জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বাজার ফান্ড’ চেঙ্গী সেতু এলাকায় আবারও ক্রেটপ্রতি ১০ টাকা করে আদায় করে। একই সংস্থা খাগড়াছড়ি থেকে বের হওয়ার পথে রামগড়ের সোনাইপুল ও মানিকছড়ির গাড়িটানা এলাকায় গাড়িপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা টোল নেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনও চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উৎপাদন বাড়লেও সংকট কাটছে না

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৬২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন আম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় আম চাষ হয়েছে ৫ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে। ধারণা করা হচ্ছে এবার উৎপাদন ৮০ হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে।

খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘খাগড়াছড়ির আম্রপালির আমের সুনাম সারা দেশে রয়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনও সন্তোষজনক হয়েছে। কিন্তু বাজারে সরবরাহ বেশি থাকা এবং বাইরের পাইকারদের আগ্রহ তুলনামূলক কম থাকায় দাম কমেছে।’

নাসির উদ্দীন চৌধুরী আরও বলেন, ‘বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষক ও ক্রেতার সরাসরি সংযোগ বৃদ্ধি এবং অনলাইনভিত্তিক বিপণনের সুযোগ তৈরি করা গেলে চাষিরা ভালো দাম পাবেন। পাশাপাশি খাগড়াছড়ির আমকে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিত করা এবং হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

খাগড়াছড়ি আমবাগান মালিক সমিতির উপদেষ্টা অনিমেষ চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে গত ১৫ বছরে আম চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চাষিরাও আম চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। কিন্তু ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’