কাউয়াদীঘি হাওরপারে মাছের বেচাকেনা, বিকেলের হাটে জমজমাট দৃশ্য
কাউয়াদীঘি হাওরপারে মাছের বেচাকেনা, বিকেলের হাটে জমজমাট

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের খইশাউড়া গ্রামের কাছে রোববার বিকেলে দেখা যায় এক মনোরম দৃশ্য। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পথে, হাওরের বিস্তীর্ণ পানিতে ছোট ছোট নৌকাগুলো কালো হাঁসের মতো ভেসে আসছে তীরের দিকে। ঘাটে এসে নৌকাগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায়, যেন দিনের শেষে বিশ্রাম নিচ্ছে। এগুলো মাছ ধরার নৌকা, আর মৎস্যজীবীরা দিনশেষে জালে ধরা মাছ নিয়ে ফিরে এসেছেন।

বিকেলের মাছের হাট

করমউল্লাহপুর কালভার্টের এলাকাটি একেকজনের কাছে একেক নামে পরিচিত। আখাইলকুড়া ও একাটুনা ইউনিয়ন দুই দিক থেকে মিলিত হয়েছে এখানে। পাশের গ্রাম করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়ার বাসিন্দারা এই জায়গাটিকে নিজেদের মতো করে ডাকেন। পড়ন্ত বিকেলে গ্রামের ইট-সুরকি বিছানো ও কাদামাটির পথে বাড়িঘরের ছায়া পড়ে। কালভার্টের ওপর নানাবয়সী মানুষের ভিড়—কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ রেলিংয়ে বসে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাউয়াদীঘি হাওর থেকে আসা পিলপিলে বাতাসে গা জুড়িয়ে নিচ্ছেন অনেকে।

এই কালভার্টটিই আসলে বিকেল বেলার মাছের হাট, যেখানে শুধু মাছের বেচাকেনা হয়। জেলেরা হাওর থেকে মাছ ধরে এনে বিক্রি করেন। কেউ মাছের ডোলা কাঁধে ঝুলিয়ে আসছেন, কেউ মাছ বিক্রি করে বাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছেন। একজনের পর একজন মাছ নিয়ে আসছেন—মাছ আসার ধারা থেমে নেই। পাইকারেরা মাছ নিয়ে আসা লোকটির দিকে ঝুঁকে পড়েন, দরদাম করে নিজের হিসাবমতো পোষালে মাছ কিনে নেন। প্লাস্টিকের ক্যারেট ও বেতের চাউঙরায় (ঝুড়ি) মাছ জড়ো করে রাখা হয়। এখানে কৌতূহলী মানুষও কম নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাছের প্রকার ও বাজার

করমউল্লাহপুর গ্রামের রেনু মিয়া ও দুরুদ মিয়া জানান, এই মাছ মৌলভীবাজার শহরের টিসি মার্কেট ও পশ্চিম বাজারে বিক্রি করা হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা প্রায় সবাই এই দুই-তিন গ্রামের মানুষ। এটি একবেলার কাউয়াদীঘি হাওরের ছোট মাছের পাইকারি বাজার, যা বিকেল চার-পাঁচটায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা হলে শেষ হয়। ততক্ষণে হাওর থেকে প্রায় সব জেলে মাছ নিয়ে ফিরে আসেন। খুচরা বিক্রেতারা মাছ নিয়ে শহরের দিকে চলে যান। এখানে আনা মাছের মধ্যে রয়েছে মখা (মলা), পুঁটি, ট্যাংরা, কই, মেনি, খইয়া, চ্যাং, চাঁদাসহ ছোট প্রজাতির নানা মাছ।

মৎস্যজীবীদের জীবন

হাওর থেকে মাছ ধরে কালভার্টের কাছে ফেরার পথে খইশাউড়ার মোশারফ মিয়ার সঙ্গে দেখা। তাঁর কাঁধে মাছের ঝুড়ি, তাতে মলাসহ বিভিন্ন তরতাজা মাছ। তিনি বলেন, ‘এখানে পাঁচ-ছয় শ টাকার মাছ আছে। বেলা দুইটার দিকে হাওরে গেছি, আর এখন ফিরেছি। প্রায় দিনই এই একবেলা মাছ মারি।’

কালভার্ট থেকে কিছুটা দূরে হাওরের জলের কাছে গেলে দেখা যায় অনেকগুলো নৌকা বাঁধা। সারা বিকেল কাউয়াদীঘি হাওরে মাছ ধরে অনেকে ঘাটে ফিরে এসেছেন। খইশাউড়ার তানজিল হাসান নৌকার পাটাতন থেকে তরতাজা মাছ প্লাস্টিকের ক্যারেটে তুলতে তুলতে বলেন, ‘এখানে পাঁচ-সাত শ টাকার মাছ আছে। বেলা দুইটার পরে আমরা হাওরে গেছি। পাতা জাল থেকে মাছ ধরছি। এখন ঘাটে এসেছি। এই মাছ বিক্রি করব। রাত তিনটার দিকে আবার নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যাব।’ তাঁরা দুজন একসঙ্গে মাছ ধরেন।

মৎস্যজীবীদের দৈনন্দিনতা

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া—এই তিন গ্রামের অনেকেই মৎস্যজীবী। বর্ষাকালে তাঁরা কাউয়াদীঘি হাওরে মাছ ধরেন। প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০টি নৌকা হাওরে যায়। কোনো নৌকায় একজন, কোনো নৌকায় দুজন থাকেন। কেউ বিকেলে মাছ ধরেন, কেউ সন্ধ্যার দিকে হাওরের নির্দিষ্ট স্থানে ছোট মাছের জাল পেতে রাখেন। শেষ রাতে গিয়ে জাল থেকে মাছ ধরে আনেন। আবার অনেকে দুই বেলাতেই হাওরে মাছ ধরেন। তারপর করমউল্লাহপুর কালভার্টে এসে ছোট বাজারে মাছ বিক্রি করেন। হাওরে যত দিন পানি থাকে, তাঁদের এ রকম মাছ ধরা ও বিক্রি নিয়মের মতো চলতে থাকে। ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলো ঘাস ও কচুরিপানার সবুজের সঙ্গে মিশে আছে। বিভিন্ন দিকে কচুরিপানা ও সবুজ জলজ উদ্ভিদের ভেতর কালো ছায়া হয়ে ছড়িয়ে আছে নৌকাগুলো।

বেলা নেই আর। শেষবেলার রঙিন ছায়া পড়েছে হাওরের পানিতে—ঢেউয়ের বুকে রঙের খেলা। তখনো হাওরের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে হঠাৎ এক-দুটি নৌকা। নৌকাগুলো কচুরিপানা ঠেলে শুকনা মাটির কাছে ভিড়তে চেষ্টা করছে। সন্ধ্যার ছায়া ঘন হয়ে আসছে গ্রামের ভেতর, হাওরের বিশাল বুকে।