গাবতলীর পশুর হাটে কাদা ও বৃষ্টিতে ভোগান্তি, বেচাকেনা কমেছে
গাবতলীর পশুর হাটে কাদা ও বৃষ্টিতে ভোগান্তি

রাজধানীর গাবতলীর পশুর হাটে মানুষের দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি নেই। কখন কোন গরু ধাক্কা দেবে, কে কাদায় পিছলে ছুটে চলা গরুর সামনে পড়ে যাবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মঙ্গলবার (২৬ মে) বৃষ্টির পর গাবতলী হাটজুড়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বৃষ্টির পর করুণ অবস্থা

সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার পর বেলা ১২টার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শুরু হয় গরু নামানো, কেনাবেচা ও মানুষের চলাচল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বেধে যায় তীব্র যানজট। গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুরমুখী সড়কে গাড়ি চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর থেকে গাবতলীমুখী সড়কেও দেড় কিলোমিটারজুড়ে তৈরি হয় যানজট।

গরুর ট্রাক, পিকআপ, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ভিড়ে সামান্য হাঁটার জায়গাও ছিল না। এর মধ্যেই ১০ নম্বর হাসিল ঘরের কাছে একটি গরু ছুটে এলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দৌড় দিতে গিয়ে পড়ে যান এক ব্যক্তি। চারপাশে শুরু হয় ছোটাছুটি। তবে কাদা ছিটকে পড়া থেকে রেহাই পাননি কেউই। গরু ব্যবসায়ীদের অনেককেই কাদায় পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাসিল ঘরে বিপত্তি

দুপুর দেড়টার দিকে আরও বিপত্তি তৈরি হয় ১০ নম্বর হাসিল ঘরের সামনে। হাসিল পরিশোধ করতে গিয়ে একটি গরু ছুটে পাশের সেডে ঢুকে পড়ে। এ সময় গরুর ধাক্কায় কয়েকজন পড়ে গেলে পাটুরিয়া থেকে আসা গরু বিক্রেতা নূর ইসলাম তাদের টেনে তোলেন।

মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত পুরো গাবতলী হাটই ছিল কাদা আর বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। কোথাও কোথাও জমে ছিল পানি। প্রধান সড়কের অনেক অংশ কাদায় ডুবে থাকতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে না বলে জানান দিনাজপুরের বিরামপুর থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী ও খামারি সাইদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “আটটা গরু এনেছি। কিন্তু বৃষ্টি আর ভোগান্তির কারণে একটা গরুও বিক্রি করতে পারিনি। আমাদের সঙ্গে চারজন লোক আছে। এই গরুগুলো বিক্রি করে লাভ হবে কিনা সেটাই এখন চিন্তা।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অপরদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, ভোগান্তির কারণে ঠিকমতো দরদামও করা যাচ্ছে না। ক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, “গরুর দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। তার ওপর কাদা আর ভিড়ের কারণে ঠিকমতো গরু দেখাও যাচ্ছে না।”

৯৬ খুঁটির সেড আড়াই লাখ টাকায়

গাবতলী হাটের বর্ধিত অংশে সারিবদ্ধভাবে গরু বাঁধার জন্য তৈরি করা হয়েছে শত শত খুঁটির সেড। এর মধ্যে ৯৬ খুঁটির একটি সেডের মালিক রফিক উদ্দিন জানান, উজারাদারের কাছ থেকে তিনি সেডটি ভাড়া নিয়েছেন আড়াই লাখ টাকায়।

তিনি বলেন, “তিন লাইনে ৩২টি করে মোট ৯৬টি খুঁটি আছে। ওপরে ত্রিপল দেওয়া, তাই বৃষ্টিতে গরুর তেমন সমস্যা হয় না।”

এই সেডে গরু রাখা কুষ্টিয়ার কুমারখালীর উদয়নাটুরিয়া গ্রামের শাহজাহান উদ্দিন জানান, তিনটি গরুর জন্য তিনটি খুঁটি বাবদ তাকে ১০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। সেডের মালিকও বিষয়টি স্বীকার করেন।

খুঁটির ভাড়া আর খরচেই শেষ লাভ

শাহজাহান উদ্দিন বলেন, “তিনটা গরু আনতে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেড ভাড়া ১০ হাজার। বড় গরুটি ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করতে চাই, কিন্তু দাম উঠেছে মাত্র ৩ লাখ। সাড়ে চার লাখের নিচে বিক্রি করলে লোকসান হবে।”

তিনি আরও বলেন, “গরুটি আড়াই লাখ টাকায় কিনেছিলাম। এক বছর ধরে পালন করেছি। প্রতিদিন ৩০০ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এরপর পরিবহন, সেড ভাড়া, নিজের খরচ—সব মিলিয়ে হিসাব করলে সাড়ে চার লাখ টাকার নিচে বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান হবে।”

সাড়ে তিন লাখ টাকার গরু বিক্রি ৫ লাখ ৫৩ হাজারে, তবু মন খারাপ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর হাবিব শেখ সকালেই তিনটি গরু বিক্রি করেছেন। সাড়ে তিন লাখ টাকায় কেনা তিনটি গরু তিনি বিক্রি করেছেন মোট ৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকায়।

এর মধ্যে একটি গরু বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার টাকায়, আরেকটি ২ লাখ ১ হাজার টাকায় এবং তুলনামূলক বড় গরুটি বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকায়। তবে হিসাব কষে খুব বেশি লাভ দেখছেন না তিনি।

হাবিব শেখ বলেন, “আট মাস পালন করতে খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকা। হাটে আনতে ১০ হাজার, সেড ভাড়া ১০ হাজার। আরও নানা খরচ আছে। সব মিলিয়ে লাভ খুব বেশি থাকে না। শেষ পর্যন্ত হয়তো ২০-২৫ হাজার টাকার বেশি থাকবে না।”

এক হাত দূরত্বে খুঁটি

গাবতলী হাটের বর্ধিত অংশে দেখা গেছে, একটির পর একটি খুঁটি পুঁতে রাখা হয়েছে। অনেক জায়গায় দুই খুঁটির দূরত্ব এক হাতেরও কম। ফলে গরু ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাবুল হোসেন বলেন, “একেকটা খুঁটির ভাড়া দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। অথচ গরু দাঁড়ানোর মতো জায়গাই নেই। ভালো সেডে গেলে আবার খুঁটির ভাড়া ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা।” একই অভিযোগ করেন কুমারখালীর খামারি ও ব্যবসায়ী তরুণ হোসেনও। তিনি বলেন, “একটা খুঁটি থেকে আরেকটা খুঁটির দূরত্ব খুবই কম। গরু ঠিকমতো বাঁধা যায় না। গরু বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। ক্রেতাদের যেমন ভোগান্তি, আমাদের ভোগান্তি আরও বেশি।”

হাসিল নিয়ে অভিযোগ নেই, সমস্যা ভিড়ে

কুমিল্লার আল আমিন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনে ৬ হাজার টাকা হাসিল দিয়েছেন। তিনি বলেন, “হাসিল বেশি নিচ্ছে না। কিন্তু হাসিল দিতে গিয়ে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। দাঁড়ানোর জায়গাই নেই।”

তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাটে অতিরিক্ত হাসিল নেওয়া হচ্ছে।

বৃষ্টি আর ভোগান্তিতে কমেছে বিক্রি

ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে গরুর দাম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্রেতাদের দাবি, গত বছর ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকায় যে গরু পাওয়া গেছে, এবার সেটি কিনতে হচ্ছে প্রায় লাখ টাকায় বা তারও বেশি দামে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৃষ্টি ও ভোগান্তির কারণে গরুর ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। খরচ অনুযায়ী লাভও থাকছে না। তাদের দাবি, সোমবার দুপুর পর্যন্ত বিক্রি ভালো হলেও মঙ্গলবার বৃষ্টির কারণে বেচাকেনা কমে গেছে।