গাবতলী হাটে খুঁটি ভাড়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
গাবতলী হাটে খুঁটি ভাড়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পানটি গ্রামের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম। গরু পালন করাই তার পেশা। তবে, এতে লাভ কম হয়। কখনও কখনও খরচ উঠাতেও হিমশিম খেতে হয়। তাই তো গরু পালনের পাশাপাশি গৃহপালিত এই প্রাণীর ব্যবসাও করেন তিনি। লাভ হয় ভালোই। তবে, তাতেও সন্তুষ্ট নন তিনি। কারণ, গরু লালন-পালন কিংবা ব্যবসায় যে লাভ হওয়ার কথা তা মাঝপথেই শেষ হয়ে যায়।

ঈদুল আজহায় গাবতলী হাটে খুঁটি ভাড়ার সমস্যা

ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী গাবতলী হাটে গরু নিয়ে এসেছেন শহীদুল। এই হাটের হাসিল নিয়ে তার কোনও অভিযোগ নেই। কিন্তু, হাটে গরু রাখা নিয়ে দেওয়া অর্থ নিয়ে নাখোশ এই ব্যবসায়ী। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “একটি গরুর জন্য এক হাত জায়গার একটি খুঁটি ভাড়া নিতে চলে যায় দেড় থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত। ইজারাদারদের যত খুঁটি আয় তত।”

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাবুল হোসেনও গরু নিয়ে এসেছেন গাবতলী হাটে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্থায়ী এই হাটের বর্ধিত অংশে গরু বাধার জন্য খুঁটি ভাড়া নিয়েছেন তিনি। বাবুল বলেন, “সেডে একটি খুঁটির ভাড়া পাঁচ হাজার। সেখানে বৃষ্টিতে গরু ভেজার ভয় নেই। সেডের বাইরে ভাড়া নিলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা লাগে। হাটের বাইরে গরু রাখতে আমার দিতে হচ্ছে এক হাজার হাজার ৪০০ টাকা।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কুমারখালীর কৃষক ও ব্যবসায়ী তরুন হোসেন জানান, হাটের বর্ধিতাংশে ১১টি খুঁটি ভাড়া নিয়েছেন তিনি। প্রতি খুঁটির জন্য দেড় হাজার টাকা দিতে হচ্ছে ইজারাদারদের। তিনি বলেন, “এসব খুঁটিতে জায়গা নেই বললেই চলে। গরু বাধা যায় না। একটি খুঁটি থেকে আরেকটি খুঁটির দূরত্ব এক হাতের মত। বাইরের দুই খুঁটির দূরত্ব এক হাতের কম। যতদিন গরু বিক্রি না হবে ততদিন গরুগুলো দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যত খুঁটি তত আয়

কুমারখালীর পানটি গ্রামের শহীদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হাটে যত খুঁটি তত বেশি আয়। গরু দাঁড়াতে পারে না অথচ একটি খুঁটির ভাড়া দেড় হাজার। দেখেন এক হাতেরও কম জায়গা রেখে আরেক খুঁটি। বেশি খুঁটি দেওয়া হয়েছে বেশি লাভ করার জন্য। যত গরু তত খুঁটি। গরু বিক্রি হয়ে গেলে নতুন করে গরু বাধলেও একই দাম, দেড় হাজার টাকা দিতে হবে।”

ঈদ পর্যন্ত এক খুঁটি কতবার খুঁটি ভাড়া হতে পারে জানতে চাইলে শহীদুল বলেন, “বাজার ভালো থাকলে দ্রুত বিক্রি হয়। তখন তিনবার পর্যন্ত ভাড়া হয়। তবে, বেচাকেনা ভালো না থাকলে একবারেই শেষ হয়ে যায়।”

গাবতলী হাটের ৯৬টি খুঁটি ভাড়া নিয়েছেন রফিক উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তিন লাইনে তার ৩২টি করে ৯৬টি খুঁটি রয়েছে। উপরে ত্রিপল থাকায় অনুন্নত হলেও এটি একটি সেড, গরু বৃষ্টিতে ভিজবে না। সামান্য ভিজলেও গরুর ক্ষতি হবে না। এই ৯৬টি গরু বাধার সেড ইজারাদারদের কাছ থেকে তাকে নিতে হয়েছে আড়াই লাখ টাকা ভাড়ায়।

এই সেডে গরু রাখা ব্যবসায়ী কুষ্টিয়ার কুমারখালীর উদয় নাতুরিয়া গ্রামের শাহজাহান উদ্দিন। তিনি জানান, এখনও একটি গরুও বিক্রি করতে পারেননি। তিনটি গরুর জন্য এই সেডের তিনটি খুঁটি বাবদ ভাড়া দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। এ সময় সেডের মালিক মালিক রফিক উদ্দিনও তা স্বীকার করেন।

লাভ খায় দালালেরা

গাবতলী হাট সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষক গরু লালন-পালন করে যে লাভ করে তার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি লাভ করে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল। কখনও কখনও দ্বিগুণের বেশি আয় করে তারা। আর গরুর লালন-পালনকারীদের (প্রকৃত কৃষক) ভাগ্যে জুটে খরচের টাকা। সামান্য লাভ হলেও তা তাদের জীবন-মান উন্নয়নে কোনও ভূমিকা রাখতে পারে না।

চুয়াডাঙ্গার গরু ব্যবসায়ী মো. আলী হিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এবার হাটে মোট ১৮টি গরু এনেছি। ৮৫ হাজার টাকায় গরুর বাছুর কিনে চার বছর লালন-পালন করে হাটে আনছি। চাওয়া দাম তিন লাখ টাকা। যা দাম হচ্ছে তাতে বিক্রি করলে লাভ হবে না। তিন লাখ টাকায় বিক্রি করলেও লালন-পালন করা গরু থেকে খরচ আসছে না।”

কেন খরচ আসছে না জানতে চাইলে মো. আলী হিম বলেন, “গরু কেনার পর থেকে প্রথম দিকে খরচ হয়েছে প্রতিদিন ২৫০ টাকা। শেষ দিকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। হিসেব করে দেখেন লাভ থাকবে কতটুকু?”

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের আনোয়ার ব্যাপারী একটি গরু দেখিয়ে বলেন, এই গরুটি কিনেছিলাম ৭০ হাজার টাকায়। এক লাখ ৭০ হাজার টাকা হলে বিক্রি করবো। আট মাসে যে খরচ হয়েছে তা উঠিয়ে লাভ করতে হলে এক লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করতেই হবে। সব খরচ বাদ দিয়ে ৬০ হাজার টাকার একটি গরুতে এবার লাভ হবে তিন থেকে চার হাজার টাকা। বাজার ভালো হলে এক লাখের একটি গরুতে ২০ হাজার পর্যন্ত লাভ হতে পারে। আবার লোকসানও হতে পারে।

কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী তরুন হোসেন বলেন, “একটি গরু কিনেছি ৯৫ হাজার টাকায়। বিক্রি করবো এক লাখ ১৫ হাজার টাকায়। চার মাসে গরুর জন্য খরচ হয়েছে দুই হাজার ৪০০ টাকা। গরু হাটে আনতে খরচ হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। লেবার খরচ একজনের জন্য দুই হাজার টাকা। হাটে আনার পর খরচ প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। ফলে লাভ বেশি থাকে না।”

গরু ব্যবসায়ীরা জানান, গরু লালন-পালন করে লাভ না থাকলেও মুনাফা করে কিছু দালাল ও হাটের ইজারাদার। এরপর চাঁদার হিসাব তো রয়েছেই।

গরুর জন্য প্রতিদিন খরচ ২৫০-৫০০ টাকা

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের গরু ব্যবসায়ী আনোয়ার ব্যাপারী জানান, নিজের পালন করা ১২টিসহ মোট ২০টি গরু এনেছেন গাবতলী হাটে। হাটের বর্ধিত অংশে খুঁটি পাওয়া এই ব্যবসায়ী বলেন, “ছোট গরু পালতে প্রতিদিন খরচ হয় ২৫০ টাকা। আর বড় গরু পালতে প্রতিদিন খরচ হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। শুধু গরু লালন-পালন করে লাভ হয় না, তাই গরু কিনে ব্যবসা করেন বাড়তি লাভের জন্য।”

কী বলছেন ইজারদার

খুঁটি নিয়ে গাবতলী হাটের ইজারাদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত কেউ বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেননি।

খুঁটি বা গরু রাখার টাকা কে পায় জানতে চাইলে গাবতলী গরু হাটের ১০ নম্বর হাসিলে দায়িত্বরত কেউ কথা বলতে চাননি। তাদের পাঁচজনকে জিজ্ঞাসা করলেও কথা বলেনি। তবে, আল নাহিয়ান সৈয়ত নামে দায়িত্বরত এক যুবক বলেন, “এখানে সবাই ব্যস্ত। এক নম্বর হাসিল ঘরে যান। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। এখানে কেউ কথা বলবে না।”

৮ নম্বর হাসিলের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি নিজের নাম প্রকাশ করবেন না জানিয়ে বলেন, “ইজারাদার হাটের ইজারা নিয়েছেন। তিনিই খুঁটি ও সেড ভাড়া দিয়েছেন বিভিন্ন লোককে।”