প্রযুক্তি ছেড়ে আনার চাষে সফলতা পেলেন শিবলী সাদিক
প্রযুক্তি ছেড়ে আনার চাষে সফল শিবলী সাদিক

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের হলিদাগাছি গ্রামে একটি অনন্য বাগান গড়ে তুলেছেন মো. শিবলী সাদিক (শুভ)। এই বাগানে সারি সারি আনারগাছ, যেখানে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে লালচে আভাযুক্ত বড় বড় আনার। নান্দনিক ও লোভনীয় এই ফলবাগান কয়েক বছরে তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।

প্রযুক্তি থেকে কৃষিতে পথচলা

একসময় শিবলী কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ করতেন। প্রযুক্তির জগৎ ছেড়ে এখন তাঁর দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে আনারবাগানে। শিবলীর এককথা, এটি তাঁর স্বপ্নের বাগান। কয়েক বছর আগে ভারতে বেড়াতে গিয়ে একটি আনারবাগান দেখে মুগ্ধ হন তিনি। ফেরার সময় একটি ডালিমের চারা নিয়ে আসেন, যা বাড়িতে লাগিয়ে আশাতীত ফলন পান।

বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু

শিবলী সাদিক বলেন, ‘ভারত থেকে “সুপার ভাগওয়া” জাতের আনারগাছে প্রথম ফলনেই আশাতীত সাড়া পাই। একটা গাছে এত ভালো ফলন দেখে মাথায় এল, এটা যদি বাণিজ্যিকভাবে করি, তাহলে লাভবান হতে পারি।’ ২০২৩ সালের আগস্টে শুরু হয় তাঁর আনারবাগানের বাণিজ্যিক যাত্রা। বর্তমানে প্রায় দুই বিঘা জমিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০টি আনারগাছ রয়েছে, যার মধ্যে ১৮০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাজারজাতকরণ ও দাম

বাজারে আনারের কেজি ৬০০ টাকার বেশি হলেও শিবলী বাগান থেকেই ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগানে এসে কিনে নেন। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে তিনি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার আনার বিক্রির আশা করছেন। প্রতি কেজিতে তিন থেকে চারটি আনার ধরে একটি আনারের দাম দাঁড়ায় ১২৫ থেকে ১৬৭ টাকা পর্যন্ত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাথমিক বাধা ও সাফল্য

শুরুটা সহজ ছিল না। রাজশাহীর মাটিতে আনার হবে না বলে অনেকে বলতেন। শিবলী বলেন, ‘যখন শুরু করি, তখন অনেকে আমাকে পাগলও বলেছে। তখন খারাপ লাগত। এখন সেই কথাগুলো মনে হলে হাসি পায়। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসে, বাগান দেখে, আনার খায়।’ তাঁর মতে, বাংলাদেশের মাটিতে আনার চাষ আগে থেকেই সম্ভব ছিল, তবে উপযুক্ত জাতের অভাব ও নার্সারি পর্যায়ের সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে এগোতে পারেননি।

প্রযুক্তির ব্যবহার

নিজের ইলেকট্রনিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পুরো বাগানে সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা বসিয়েছেন শিবলী। এতে বাগান নিয়ে তাঁর আর চিন্তা করতে হয় না, শ্রমিক খরচও কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘বছরে প্রায় সাত হাজার টাকা খরচে পুরো বাগান মনিটর করছি। যদি মানুষ রাখতে চাইতাম, তাহলে বছরে এক লাখের বেশি খরচ হতো।’

চারা বিক্রি থেকে আয়

শিবলীর বেশির ভাগ গাছের ডালে কলম দেওয়া হয়েছে, যা টবে রোপণ করে তিনি ৩৫০ টাকা করে বিক্রি করেন। চারার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই বাড়ির আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে গাছ লাগাতে চান। শিবলী তাদের পরামর্শ দেন, ‘আগে পাঁচ-দশটা গাছ নিয়ে স্টাডি করেন। ভালো ফল পেলে পরে বাণিজ্যিকভাবে করবেন।’

সরেজমিনে বাগান পরিদর্শন

সম্প্রতি চারঘাটের হলিদাগাছি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের ভেতরের রাস্তার পাশে ঝুলন্ত সাইনবোর্ড অনুসরণ করে বাগানে পৌঁছানো যায়। মূল বাগানে ঢোকার আগেই টবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য আনারের চারা। ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ে একই গাছে কোথাও পরিপক্ব আনার, কোথাও নতুন ফুল ও ফল পাকার অপেক্ষা। বেশির ভাগ গাছের ডালে পাটের বস্তার অংশ দিয়ে কলম বাঁধা হয়েছে।

আনারবাগান দেখতে আসা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের মাটিতে এমন আনার হবে, আগে ভাবিনি। দেখে আমারও ইচ্ছা হচ্ছে ছোট পরিসরে শুরু করি।’ শিবলী সবাইকে আনার কেটে খাওয়ান, আর ঘুরতে আসা কয়েকজন জানান, স্বাদ বাজারের আনারের মতোই।

শিবলী সাদিকের স্বপ্ন, ‘দেখবেন, হয়তো ১০ বছর পর বাংলাদেশে আনার আমদানি লাগবে না। বরং আমরা আনার রপ্তানি করব।’