রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও মশা নির্মূলে সব রাজনৈতিক দল এবং নগরবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন?’ শীর্ষক নগর সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এই আহবান জানান।
জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা
ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, রাজধানীর বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তন করে একটি মানসম্মত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সমষ্টিগত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ঢাকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত, আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় শহর এবং মশার নগরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। জনগণ যদি ৫০ শতাংশ এবং সরকার বা সিটি করপোরেশন যদি বাকি ৫০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করে, তাহলে শতভাগ সফলতা অর্জন অসম্ভব নয়।
তিনি ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে দেশ এক মহাসংকট ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ দ্রুত সেই অবস্থা কাটিয়ে ওঠে। বর্তমানে জাতীয় সমস্যাগুলোর সঠিক নেতৃত্ব ও সমষ্টিগত ঐক্যের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএসসিসির উদ্যোগ
প্রশাসক জানান, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মশা ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার দাবি, প্রায় ৯৯ শতাংশ মশার জন্ম হয় জলাবদ্ধতা থেকে। তাই জলাবদ্ধতা দূর করতে পারলে ডেঙ্গুর প্রকোপও কমানো সম্ভব। প্রথমবারের মতো ডিএসসিসি প্রাক-বর্ষা মশার লার্ভা নিধনে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আওতায় ৩৬ জন মাঠকর্মী প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালাচ্ছেন। মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে লার্ভার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, ৫৪ বছর আগে ঢাকা শহরে প্রায় ৫০টি প্রাকৃতিক খাল ও লেক ছিল। এখন কতটি আছে, তা সবাই জানেন। একক কোনো সংস্থার পক্ষে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সারা বছরই ঢাকার বিভিন্ন সড়ক কখনো বিদ্যুৎ, কখনো গ্যাস, আবার কখনো পানির লাইনের জন্য খোঁড়া হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে এবং জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি এক শহরকে দুই সিটি করপোরেশনে ভাগ করাও ব্যবস্থাপনার বড় সমস্যা।
ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপ নিয়ে সতর্ক করে ড. আলী আফজাল বলেন, ২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ৪ কোটিতে এবং ২১০০ সালে তা ৬ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জনবহুল দেশ, এটি আমেরিকা বা অষ্ট্রেলিয়া নয়। ভবিষ্যতে জনসংখ্যা আরও বাড়বে। তাই এক ইঞ্চি আবাদি জমিও যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই পরিকল্পনা নিতে হবে। আবাসন, শিল্প ও বনায়নের জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চল নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি।
প্রবন্ধ উপস্থাপন
নগর সংলাপে দুটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বর্ষায় মশা বিষয়ক প্রবন্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় জমে থাকা পানিতে ৬৪ শতাংশ মশার জন্ম হয়। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা ও মশার সমস্যা সমাধানে নগরবাসীকেও দায়িত্ব নিতে হবে। নিজ নিজ বাসা ও আঙিনা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এছাড়া ঢাকার মোট মশার প্রায় ৯৯ শতাংশই জলাবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে না পারে, তাহলে মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। বাকি অল্পসংখ্যক মশা বিভিন্ন পাত্রে জন্ম নেয়, যার মধ্যে এডিস মশাও রয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ক আরেক প্রবন্ধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুল্লাহ বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার জন্য দ্রুত ড্রেনেজ সার্কেলের জনবল কাঠামো অনুমোদন করে কার্যক্রম চালু করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার অবসরপ্রাপ্ত ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক হিসেবে সিটি করপোরেশনে যুক্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার বিদ্যমান স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান অনুসরণ, সমন্বিত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং ওয়ার্ড ও ব্লকভিত্তিক নাগরিক কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়। তিনি বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে স্টেকহোল্ডার কমিটি গঠন এবং টেকসই নগর পরিকল্পনার জন্য সরকারপ্রধানের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনা জরুরি।
অন্যান্য বক্তা
নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সঞ্চালনায় নগর সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি এ কে এম শহিদ উদ্দিন, বায়ুমণ্ডলী দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, স্থপতি খালিদ মাহমুদ শাহীন, নগর সাংবাদিক অমিতোষ পাল প্রমুখ।



