নিরাপদ কুরবানির গরু নিশ্চিতে মোবাইল কোর্টের বিজ্ঞানভিত্তিক অনুশাসন জরুরি
নিরাপদ কুরবানির গরু: মোবাইল কোর্টের বিজ্ঞানভিত্তিক অনুশাসন

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম

আসন্ন কুরবানির ঈদে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৭ হাজার, যার বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু। তবে এই উদ্বৃত্ত সরবরাহের মধ্যেও উদ্বেগের বিষয় হলো কৃত্রিম উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার।

গরু মোটাতাজাকরণে ক্ষতিকর পদ্ধতি

গরু মোটাতাজা করে অতি মুনাফা অর্জনের নেশা বাংলাদেশে এক অভিশাপে পরিণত হয়েছে। কৃত্রিমভাবে পুষ্ট গরু আর প্রাকৃতিক খাবারে পুষ্ট গরুর পার্থক্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। বিক্রীত গরুর কোনো ওয়ারেন্টি না থাকায় রোগাক্রান্ত বা কৃত্রিম খাবারে পুষ্ট গরুর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সুযোগ নেই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৮৮ সালে স্টেরয়েডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও বাংলাদেশের অনেক খামারি গ্রোথ হরমোন হিসেবে স্টেরয়েড ব্যবহারে সতর্ক নন। মাত্রাধিক প্রয়োগে গরুর অকালমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি অতিরিক্ত ইউরিয়া খাইয়ে রাতারাতি গরু মোটাতাজা করার প্রবণতা দেখা যায়। ইউরোপে ইউরিয়া বিপজ্জনক খাদ্য হিসেবে চিহ্নিত হলেও অনুন্নত দেশে এটি সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন গরু ও মানুষ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।

স্টেরয়েডের প্রভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

স্টেরয়েডের সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় গরুর পরিপাকতন্ত্র 'হাইপার অ্যাকটিভ' হয়ে যায়। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ক্ষুধা ও পিপাসা অনুভূত হওয়ার ফলে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের কারণে পরিপাকতন্ত্রের ওপর অসহনীয় চাপ পড়ে। পরিপাকতন্ত্র অতিরিক্ত খাদ্য হজমে ব্যর্থ হওয়ায় শরীরে সঞ্চিত খাবার গরুর কিডনিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। শরীরে সঞ্চিত অতিরিক্ত পানি ও মূত্র অনিষ্কাশিত থাকায় গরুর শরীর ফুলে যায়। কুরবানির ঈদের তিন থেকে ছয় মাস আগে গরু কিনে খামারে বা বাড়িতে এ প্রক্রিয়া চালানো হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও শতভাগ অনুশাসন বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন। গবাদিপশুর প্রতিষেধক মেয়াদোত্তীর্ণ কি না, যথাযথভাবে সংরক্ষিত কি না, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। কোনটি অপরাধ, কোনটি নয়, তা বোঝার জন্য খামারিদের যুগপৎ প্রশিক্ষণ ও আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য।

পশুতে বিষক্রিয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ফুডচেইনের মাধ্যমে বিষযুক্ত মাংস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। কিডনি, লিভার, হার্টসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে মানবদেহে, এমনকি গর্ভবতী মহিলার হরমোন ভারসাম্যও নষ্ট হয়।

আইনি কাঠামো ও মোবাইল কোর্টের ভূমিকা

খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এ অপরাধ দমনে প্রয়োজন আইনের কঠোর অনুশাসন এবং ক্রেতা সাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। যে পশু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা হচ্ছে, সেটি পাপাচারের সাক্ষী হয়ে আল্লাহর দরবারে রেকর্ড হচ্ছে, যার পরকালীন পরিণতি ভয়াবহ।

এ অপরাধ বন্ধে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পৌর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় মোবাইল কোর্টের অভিযান অপরিহার্য। মোবাইল কোর্ট ভেজালবিরোধী বহু অপরাধ দমনে এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে অনন্য সফলতা এনেছে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ১০২ নম্বর তফসিলে 'মৎস্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০' অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ আইনের ১২(১)(ক) ধারামতে, মৎস্য বা পশুখাদ্যে মানুষ, পশু, মৎস্য বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পদার্থ থাকলে এবং ১২(১)(খ) ধারা অনুযায়ী, ওই খাদ্যমান আদর্শ মানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া ১৪(১) ধারায় মৎস্য ও পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড, কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং গরুতে বিষাক্ত পদার্থ বা ওষুধের উপস্থিতি প্রমাণিত হলে মোবাইল কোর্টের আওতায় তাৎক্ষণিক জেল-জরিমানা প্রয়োগ করতে হবে।

ক্ষতিকর এসব গরু ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮)-এর ৫১৬এ থেকে ৫২৫ ধারার আলোকে জব্দ করে ধর্মীয় বিধি মোতাবেক জবাই করে নির্দিষ্ট বর্জ্যাগারে বা জনবসতি থেকে দূরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। পশুর হাটে আনা কুরবানির গরু প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে র্যান্ডম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। নতুবা আইন প্রয়োগের সার্থকতা থাকবে না।

সচেতনতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি

মানুষকে বোঝাতে হবে, কুরবানির সার্থকতা শুধু মোটা বা তাজা গরু নয়, বরং ধর্মীয় বিধান হলো নিখুঁত ও স্বাস্থ্যবান গরু কেনা। অতিমুনাফার লোভে বিষাক্ত খাদ্য ও ওষুধে লালিত পশু ধ্বংস করলে ভবিষ্যতে তা অপরাধ বন্ধের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। যুক্তরাজ্যে ১৯৮৮ সালে 'ম্যাডকাউ' ডিজিজ উদ্ঘাটিত হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক গরু ধ্বংস করে ফেলা হয়, যা বাজারে বিক্রির কোনো সুযোগ ছিল না। অথচ বাংলাদেশে রোগাক্রান্ত গরু জবাই করে সুস্থ গরু দেখিয়ে বাজারে বিক্রির ঘটনা ঘটছে।

এ মানবস্বাস্থ্য বিধ্বংসী অপরাধ প্রতিরোধে অপরাধীর জেল-জরিমানা ও অসুস্থ পশু ধ্বংসের মাধ্যমে বিক্রেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, যেকোনো অপরাধ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক উৎঘাটন ও বিচার কার্য যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, তার লক্ষ্যে প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক রায় এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োগ।

সরকারের প্রতি আহ্বান

সরকারকে আহ্বান জানানো হচ্ছে, গবাদিপশু, মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবারের আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হলে ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। মিল্কভিটা নামক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, গরুর জেনেটিক গুণাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সুতরাং জিনগতভাবে গরুকে উন্নত করতে হবে এবং গোখাদ্য উৎপাদন ও গোখাদ্যের মান বাড়াতে হবে। বিদেশ থেকে উৎকৃষ্ট মানের সিমেন আমদানি নিশ্চিত করতে হবে।

আর মাত্র ৭ দিন পর ঈদুল আজহা। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কারিগরি জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ সক্ষমতা নিয়ে মোবাইল কোর্ট মাঠে নামাতে হবে।

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত সচিব