পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী হাজারীবাগ পশুর হাটে এখন জমে উঠেছে পশু কেনা-বেচা। নতুন ঠিকানায় বসা এ হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেপারিরা তাদের বড় বড় দেশি গরু নিয়ে এসেছেন। হাট জুড়ে এখন ‘নবাব’, ‘লালবাবু’, ‘লাল পাহাড়’, ‘লাল বাহাদুর’ ও ‘পাবনার বাহাদুর’ নামের গরুগুলো ঘিরে ক্রেতাদের ভিড় ও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
হাটজুড়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়
সরেজমিনে দেখা যায়, হাটজুড়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। কোথাও দরদাম চলছে, কোথাও আবার গরুর শরীর, দাঁত ও গঠন দেখে যাচাই করছেন ক্রেতারা। পাবনা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ ও সাঁথিয়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেপারিরা জানান, তারা কয়েক মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় নিয়ে গরুগুলো লালন-পালন করেছেন। গরুগুলোকে ঘাস, লতাপাতা, খড়, ভুসি ও চিটাগুড়সহ দেশিয় খাবার দিয়েই বড় করা হয়েছে বলে তারা জানান।
কুষ্টিয়ার বেপারি ইকরামের গরু ‘নবাব’ ও ‘লালবাবু’
কুষ্টিয়া থেকে আসা বেপারি ইকরাম জানান, তিনি প্রায় তিন বছর ধরে দুইটি গরু ‘নবাব’ ও ‘লালবাবু’ লালন-পালন করেছেন। গরু দুটিকে সম্পূর্ণ নিজের তত্ত্বাবধানে বড় করেছেন এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম খাবার ব্যবহার করা হয়নি। নবাবের ওজন ৯ মন এবং দাম ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর লালবাবুর ওজন ৮ মন, দাম ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তিনি আশা করছেন, বাজার ভালো থাকলে ভালো দাম পাবেন।
পাবনার বেপারি মোহাম্মদ সিয়াম হোসেনের ‘লাল পাহাড়’
পাবনা থেকে আসা বেপারি মোহাম্মদ সিয়াম হোসেন এবার মোট ১৮টি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। এর মধ্যে ‘লাল পাহাড়’ নামের দুটি বড় গরু হাটে বিশেষ নজর কেড়েছে। তিনি জানান, গরুগুলো তিনি দুই থেকে তিন বছর সময় নিয়ে লালন-পালন করেছেন। সবগুলো গরুকে ঘাস, লতাপাতা, খড়, ভুসি ও চিটাগুড়সহ দেশিয় খাবার দিয়েই বড় করা হয়েছে। ‘লাল পাহাড়’-এর ওজন ৯ মন এবং অন্যটি ১০ মন। তিনি আরও জানান, একটি গরুর দাম ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং অন্যটির দাম প্রায় ৪ লাখ টাকা চাচ্ছেন।
পাবনার বেপারি মোমিনের ‘পাবনার বাহাদুর’
পাবনার বেপারি মোমিন সাতটি গরু নিয়ে এসেছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় গরুটির নাম ‘পাবনার বাহাদুর’। তিনি বলেন, গরুগুলো তিনি ৬ মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে লালন করেছেন। এগুলোও ঘাস, লতাপাতা, খড়, ভুসি ও চিটাগুড়সহ দেশিয় খাবার দিয়েই বড় করা হয়েছে। ‘পাবনার বাহাদুর’সহ গরুগুলোর ওজন ৮ থেকে ১৩ মন পর্যন্ত। তিনি জানান, বাজারের পরিস্থিতি বুঝে দাম নির্ধারণ করেছেন।
পাবনার বেপারি হাসিবুলের ‘লাল বাহাদুর’
পাবনা থেকে আসা বেপারি হাসিবুল পাঁচটি গরু নিয়ে এসেছেন, যার মধ্যে ‘লাল বাহাদুর’ নামের গরুটি নিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, গরুটি প্রায় ৪ মাস ধরে লালন করেছেন। এর ওজন প্রায় ৭ মন এবং দাম চাচ্ছেন ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।
সাঁথিয়ার বেপারি আলিম উদ্দিনের ১৬ গরু
পাবনার সাঁথিয়া থেকে আসা বেপারি আলিম উদ্দিন এবার ১৬টি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। তিনি জানান, প্রতিটি গরু তিনি ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত সময় নিয়ে বড় করেছেন। প্রতিটি গরুর দাম ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে আশা করছেন তিনি।
কুষ্টিয়ার বেপারি ওসমান গনির ছয় গরু
কুষ্টিয়া থেকে আসা বেপারি ওসমান গনি ছয়টি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। তিনি জানান, তিনি ৮ মাস থেকে ৩ বছর পর্যন্ত সময় নিয়ে গরুগুলো লালন করেছেন। গরুগুলোর ওজন সাড়ে তিন মন থেকে সাড়ে ছয় মন পর্যন্ত। প্রতিটির দাম ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত চাচ্ছেন এবং এবার ভালো বাজার পাওয়ার আশা করছেন।
হাটের ইজারাদারের আশা
হাটের ইজারাদার নাফিজ কবির বলেন, হাজারীবাগ হাট আমাদের পুরনো ঐতিহ্যের অংশ। এবার মোহাম্মদপুরের হাট না থাকায় আগে থেকেই গরু আসা শুরু হয়েছে। গত বছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার গরু এসেছে। এবার ৪০ থেকে ৫০ হাজার গরু আসবে বলে আশা করছি। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দুপুর থেকে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাটে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। আলো, শব্দ আর মানুষের কোলাহলে পুরো এলাকা যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশে পরিণত হয়। নতুন ঠিকানায় বসেও হাজারীবাগ পশুর হাট তার পুরনো ঐতিহ্য ও প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রেখেছে।



