একসময় কোরবানির ঈদ মানেই ছিল সীমান্ত পথে ভারতীয় গরুর অপেক্ষা, বাজারে অস্থিরতা ও পশু ঘাটতির আশঙ্কা। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। দেশের পশুর বাজারগুলোতে এখন স্থানীয় খামারে লালিত গরু, ছাগল ও মহিষের ছড়াছড়ি। সরকারি তথ্য বলছে, এ বছর কোরবানির চাহিদা মেটানোর পরও বাংলাদেশে প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। অর্থাৎ একসময় আমদানিনির্ভর দেশটি এখন কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
উৎপাদন ও চাহিদার তুলনা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ১ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩৪টি। অন্যদিকে, প্রাপ্যতা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতি ৫ হাজার ৬৫৫টি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও একই ধারা দেখা গেছে। ২০২৩ সালে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ পশু উৎপাদিত হয়েছিল, যেখানে কোরবানি হয়েছিল প্রায় ১ কোটি। ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ২১ লাখ, কোরবানি প্রায় ৯৫ লাখ। ২০২৫ সালে উৎপাদন ১ কোটি ২৪ লাখের বিপরীতে কোরবানি হয় প্রায় ৯০ লাখ। উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
খামারিদের চাপ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও খরচ বাড়ায় চাপে রয়েছেন খামারিরা। পশুখাদ্য, শ্রম, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি মাঝারি ও বড় খামারিদের জন্য মুনাফার অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
২০০৭ সাল থেকে ঢাকার উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকায় 'এইচআর এগ্রো ফার্মস' পরিচালনা করা গরু ও ছাগলের খামারি রবিউল সানী বলেন, এ বছরের পরিস্থিতি আগের বছরগুলোর চেয়ে ভিন্ন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, পশুখাদ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পশুর দাম গত বছরের কাছাকাছি রয়েছে। ছোট পশুর চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি, অন্যদিকে বড় পশু তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
আদিল ডেইরি ফার্মের মালিক আদিল হোসেন বলেন, তিনি এ বছর কুষ্টিয়া থেকে ১৫০ থেকে ২০০টি গরু আনতে প্রস্তুত হয়েছেন। তবে উৎপাদন খরচ বাড়ায় মাঝারি আকারের গরুর দাম গত বছরের চেয়ে বেশি হতে পারে। আগে যে গরু এক লাখ টাকার কিছু বেশি বিক্রি হতো, সেটি এখন প্রায় দেড় লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নিলয় হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এ বছর বড় পশুর চাহিদা কমেছে। পশুখাদ্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি বড় খামারিদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে, অনেকে লোকসানের কারণে খামার বন্ধ করার কথা ভাবছেন।
আঞ্চলিক বৈষম্য
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহে আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকলেও উত্তরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ঢাকায় চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি পশু, যেখানে প্রাপ্যতা ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি। চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে যথেষ্ট উদ্বৃত্ত রয়েছে। শুধু রাজশাহীতেই চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৯ লাখ বেশি পশু রয়েছে। ফলে রাজধানীর বাজারগুলোতে উত্তরাঞ্চল থেকে প্রচুর পশু আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হক বলেন, এ বছর পশুর কোনো ঘাটতি নেই এবং চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
বাজার ব্যবস্থাপনা
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর বাজার বসবে। রাজধানীতে ২৭টি বাজার নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় ১৬টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় ১১টি। এসব বাজারে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মোতায়েন থাকবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর-রশিদ সম্প্রতি বলেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে সরকার। বাজার ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২৪ ঘণ্টা মোতায়েন থাকবে। স্থানীয় খামারিদের সুরক্ষায় সীমান্তবর্তী পশুর বাজার নিয়ন্ত্রণেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, বাজার ব্যবস্থাপনাও জোরদার করতে হবে। অন্যথায় উদ্বৃত্ত পশুর চাপ শেষ পর্যন্ত খামারিদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।



