কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের সুমিষ্ট ও রসালো লিচু এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। উপজেলার মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে পুরোদমে শুরু হয়েছে ‘মঙ্গলবাড়িয়া লিচুর’ বেচাকেনা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ক্রেতা ভিড় করছেন এ গ্রামে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলের লিচুকে ঘিরে প্রায় ১২ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
লিচু চাষে ভাগ্য বদল
শুধু মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামই নয়, লিচু চাষ করে ভাগ্য বদলেছে উপজেলার কুমারপুর, নারান্দী ও হোসেন্দী গ্রামের অনেক মানুষেরও। রসে টইটম্বুর, সুগন্ধি ও অনন্য স্বাদের কারণে এ লিচুর পরিচিতি এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য
অন্যান্য জাতের লিচুর তুলনায় মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর রয়েছে বেশ কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য। লিচুগুলো আকারে বড়, দেখতে আকর্ষণীয় গোলাপি রঙের এবং আগাম জাতের। এছাড়া এর বিচি অত্যন্ত ছোট হওয়ায় শাঁসের পরিমাণ বেশি থাকে, যা ক্রেতাদের কাছে একে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
সরেজমিন চিত্র
সরেজমিন গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ আবাদি জমি ও বসতবাড়ির আঙিনাজুড়ে রয়েছে লিচুগাছ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ১০ থেকে ২০টি পর্যন্ত লিচুগাছ রয়েছে। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা লিচু। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন লিচু কিনতে আসছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ কেউ আবার এই ঐতিহ্যবাহী লিচু বাগানে এসে মোবাইল ফোনে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন।
ইতিহাস ও বর্তমান বাজার
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ শাসনামলে এক ব্যক্তি চীন থেকে কয়েকটি লিচুর চারা এনে মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে রোপণ করেছিলেন। সেখান থেকেই শুরু হয় মঙ্গলবাড়িয়া জাতের লিচুর আবাদ। পরবর্তীতে এর সুমিষ্ট স্বাদ ও রসাল গুণের কারণে আশপাশের গ্রামেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এটি। বর্তমানে বাজারে এ লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আকার ও মানভেদে মাঝারি আকারের ১০০টি লিচু ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বড় আকারের ১০০টি লিচুর দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
বাম্পার ফলন ও পাহারা
চাষিরা জানান, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে বাদুড় ও পাখির হাত থেকে ফল রক্ষা করতে রাত জেগে বৈদ্যুতিক বাতি, টিনের তৈরি শব্দযন্ত্র ও ভেঁপু বাজিয়ে বাগান পাহারা দিচ্ছেন মালিক ও শ্রমিকরা।
ব্যবসায়ীর প্রতিক্রিয়া
মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের লিচু ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবীর বলেন, এ বছর সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় লিচুর ফলন খুব ভালো হয়েছে। প্রতিদিন ভালো বিক্রি হচ্ছে। আমি এবার ৫০০টি লিচুগাছ অগ্রিম কিনেছি। আশা করছি, প্রায় এক কোটি টাকার লিচু বিক্রি করতে পারব।
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো পরিচর্যা ও ওষুধ প্রয়োগ করায় এবার চাষিরা বাম্পার ফলন পেয়েছেন। তিনি বলেন, এলাকায় প্রায় আট থেকে নয় হাজার গাছে ফলন হয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, দেশসেরা এই লিচুর ‘জিআই পণ্য’ স্বীকৃতির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।



