অবৈধ চাঁইয়ে পাঙাশ পোনা নিধন: দক্ষিণাঞ্চলে মাছের বংশবিস্তার হুমকির মুখে
অবৈধ চাঁইয়ে পাঙাশ পোনা নিধন: দক্ষিণাঞ্চলে সংকট

বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে অবৈধ চাঁইয়ের অবাধ ব্যবহারে হুমকির মুখে পড়েছে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার। বিশেষ করে বিশালাকৃতির চাঁইয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নিধন করা হচ্ছে পাঙাশের পোনা। দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র এসব নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করে আসছে। মৎস্য বিভাগ মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু চাঁই জব্দ করলেও মূল চক্রটি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

আইন ও বাস্তবতা

সরকারি বিধি অনুযায়ী, প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটারের নিচে পাঙাশ ধরা নিষিদ্ধ। তবে আইনের বাস্তবায়ন ও জেলেদের মধ্যে সচেতনতার অভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না।

চাঁই তৈরির চক্র

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি করা হয় বড় আকৃতির ভয়ংকর চাঁই। এসব চাঁই বিক্রি হয় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। মূলত পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার একটি সংঘবদ্ধ চক্র এসব চাঁই তৈরি করে। একই সঙ্গে চাঁইয়ে ব্যবহৃত মাছের খাবারও তারা প্রস্তুত করে। বাউফলের আরেকটি সংঘবদ্ধ চক্র দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীতে এসব চাঁই দিয়ে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পোনা নিধনের মাত্রা

জেলেরা জানান, এই ফাঁদে জোয়ারের স্রোতে ভেসে আসা লাখ লাখ পাঙাশের পোনা আটকা পড়ে প্রতিদিন নিধন হচ্ছে। এসব পোনার ওজন ৪০টি মিলে এক কেজি—অর্থাৎ অত্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ। একজন জেলের চাঁইয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২০ কেজি পোনা ধরা পড়ে, যা পরে বাজারে ‘ট্যাংরা’ মাছ নামে বিক্রি করা হয়। অথচ প্রকৃত ট্যাংরা একটি স্বতন্ত্র প্রজাতির ক্যাটফিশ, যা সাধারণত ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটারের বেশি বড় হয় না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রভাবিত এলাকা

পটুয়াখালী ও ভোলার হাদির চর, চরগুণী, মাঝের চর, পাতার চর, চর বোরহান, চর কলমি, চর কাজল, বনতলী, চর মন্তাজ, চর বিশ্বাস, ছোট বাইশদিয়া ও চালিতাবুনিয়া; বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়া সংলগ্ন মেঘনা নদী; বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর—এই নদীগুলোর মোহনায় প্রতিদিন চলছে এই নিষিদ্ধ শিকার। বরিশালের সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর, তেঁতুলিয়া-মেঘনা ও পদ্মা-মেঘনার সংযোগস্থলগুলো পাঙাশ পোনার গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র। এসব নদীতে অন্তত ৫০ জন জেলে নিয়মিত চাঁই ব্যবহার করে পোনা শিকার করছেন।

স্থানীয় অভিযোগ

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা, পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনার কতিপয় অসাধু জেলের সহযোগিতায় বাউফলের এই সংঘবদ্ধ চক্র বড় আকারের নৌকা নিয়ে নদীর গভীরে গিয়ে চাঁই বসিয়ে পোনা ধরছে। মৎস্য বিভাগ অভিযান চালালেই তারা এলাকা পরিবর্তন করে।

প্রযুক্তির ব্যবহার

জেলে ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অপেক্ষাকৃত গভীর স্থানে এসব চাঁই ফেলা হয় এবং এতে প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়। নদীর গভীরে ফেলা চাঁই শনাক্ত করতে জেলেরা হোয়াটসঅ্যাপের লাইভ লোকেশন ব্যবহার করে। ফলে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা অনেক খোঁজাখুঁজির পরও এগুলো সহজে উদ্ধার করতে পারেন না।

সম্প্রতি উদ্ধার

গত ১৩ ও ২৫ এপ্রিল মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়া সংলগ্ন মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে দুটি বিশাল আকৃতির চাঁই উদ্ধার করা হয়। ১ মে গভীর রাতে নৌ পুলিশ বরগুনার তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া সংলগ্ন পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর মোহনা থেকে আরও দুটি চাঁই উদ্ধার করে। এ সময় বাউফল উপজেলার তানজিন মোল্লা ও মো. জোবায়ের নামের দুই জেলেকে আটক করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে তালতলী নৌ পুলিশের পরিদর্শক সাগর ভদ্র বাদী হয়ে শনিবার দুপুরে তালতলী থানায় মামলা করেন।

তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী দুলাল হোসেন বলেন, চাঁইগুলো এত বড় যে প্রতিটির ভেতরে দু-তিনজন মানুষ ঢুকতে পারেন। একেকটিতে আড়াই থেকে তিন মণ মাছ ধরা পড়ে। প্রশাসন কিছু চাঁই পুড়িয়ে ফেললেও এই চক্রকে থামানো যাচ্ছে না।

মৎস্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য

হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর নদীর গভীরে এসব চাঁই ফেলা হয়। এগুলো এত গভীরে পাতা থাকে যে আমরা দুই-তিন ঘণ্টা অনুসন্ধান করেও শনাক্ত করতে পারি না। পুরো দক্ষিণাঞ্চলে এ ধরনের বেশ কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। আমরা নিয়মিত অভিযান চালালেও এগুলো জব্দ করা কঠিন।’

চাঁই তৈরির বিস্তার

জেলেদের ভাষ্যমতে, পটুয়াখালীর বাউফল ছাড়াও বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ, ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরায় এসব চাঁই তৈরি হয়। এসব চাঁই নদীর ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীরে ফেলার আগে এর মধ্যে শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেল মিশিয়ে তৈরি মণ্ড দেওয়া হয়। ছয় ঘণ্টার মধ্যে চাঁইগুলো মাছের পোনায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাজারে বিক্রি

এসব চাঁইয়ে ধরা পাঙাশের পোনা প্রকাশ্যে ট্যাংরা মাছ বলে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বাজারগুলোতে তিন থেকে সাত ইঞ্চি আকারের পাঙাশের পোনা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ট্যাংরা মাছের পিঠ কালচে এবং পেট রুপালি-সাদা হয়। এদের ফুলকা ধূসর-বাদামি রঙের হয়ে থাকে।

নগরের চৌমাথা বাজারের খুচরা মাছ বিক্রেতা মো. হাসান জানান, তাঁরা এগুলো পাঙাশ-ট্যাংরা হিসেবেই জানেন। তাই আড়ত থেকে কিনে এনে বিক্রি করেন। বাজারে এই মাছের চাহিদাও বেশি। ট্যাংরা ও পাঙাশ আলাদা প্রজাতি—এ তথ্য তাঁদের জানা নেই।

গবেষণার তথ্য

২০১৭ সালে ইকো ফিশ বাংলাদেশ প্রকল্পের গবেষকেরা তেঁতুলিয়া নদী ঘিরে পাঙাশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করেন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় এসব এলাকাকে পাঙাশ সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গবেষণায় ১২টি স্থান চিহ্নিত করা হয়, যা ক্যাটফিশজাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র। এসব এলাকায় সংঘবদ্ধ জেলে চক্র চাঁই ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক ছোট পাঙাশ ধরেন।

মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এসব প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করা গেলে প্রায় বিপন্ন এই প্রজাতিকে আবার নদীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সচেতনতার অভাবে পোনা নিধন অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ জন জেলে প্রতিদিন চাঁই ব্যবহার করে বিপুল পোনা ধরছেন, যার ওজন ৪০টিতে এক কেজি। প্রতিদিন একজন জেলের চাঁইয়ে গড়ে ১২০ কেজি পোনা ধরা পড়ে। ফলে ছয় মাসে অন্তত দুই কোটি পোনা নিধন হচ্ছে। এসব পোনা বাজারে ‘নদীর ট্যাংরা’ নামে বিক্রি করা হয়।

মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এখন চাঁই দিয়ে পাঙাশের পোনা নিধনে আরও অনেক অসাধু জেলে সম্পৃক্ত হয়েছেন। এঁদের রোধ করা না গেলে দেশের নদ-নদীতে পাঙাশের প্রজনন, উৎপাদন তলানিতে নামার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য এই ভয়ংকর চাঁই ও অসাধু জেলে চক্রের বিরুদ্ধে মৎস্য বিভাগ, প্রশাসনের কঠোর অভিযান চালানো প্রয়োজন।

মৎস্য অধিদপ্তরের বক্তব্য

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘এটি পাঙাশের বংশবিস্তারের জন্য মারাত্মক হুমকি। আমরা নিয়মিত অভিযান চালালেও শনাক্ত করা কঠিন, কারণ রাতে গভীর নদীতে চাঁই পাতা হয়। এই ভয়ংকর পদ্ধতি বন্ধ করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে পাঙাশের প্রাচুর্য বহুগুণে বাড়বে। আমরা বড় পরিসরে অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেব।’