আনোয়ারার সাফল্যে অনুপ্রাণিত উপকূলের হাজারো নারী
আনোয়ারার সাফল্যে অনুপ্রাণিত উপকূলের হাজারো নারী

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীরবর্তী চর মানিকা ইউনিয়নের চর আইচা গ্রামের সংগ্রামী নারী আনোয়ারা বেগম। স্বামী হারানোর পর ছোট ছেলে ও বৃদ্ধ মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পড়ে তার কাঁধে। সীমিত সুযোগ আর অভাবের সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল দূর আকাশের স্বপ্ন।

পিকেএসএফ ও এফডিএ-র আরএইচএল প্রকল্পে ভরসা

ঠিক তখনই তার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়নে এবং পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “Resilient Homestead and Livelihood Support to the Vulnerable Coastal People of Bangladesh (RHL)” প্রকল্প। এই প্রকল্পের আধুনিক উঁচু মাচার ছাগলের ঘর এবং জলবায়ু-সহনশীল পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পান আনোয়ারা।

২০,০০০ টাকা ঋণে শুরু ছোট খামার

প্রশিক্ষণ শেষে ২০,০০০ টাকার একটি ঋণ নিয়ে আনোয়ারা তার ছোট্ট খামার শুরু করেন। অক্লান্ত পরিশ্রম, সঠিক যত্ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে তার খামারে ছাগলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত ঈদুল আজহায় তিনি তার খামারের ২টি সুস্থ-সবল ছাগল ভালো দামে বিক্রি করেন, যা ছিল তার আর্থিক স্বাধীনতার পথে এক বিশাল মাইলফলক।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাফল্যে বদলে যাচ্ছে গ্রামের চিত্র

আনোয়ারার এই সাফল্য শুধু তার পরিবারকেই বদলে দেয়নি, বরং পুরো গ্রামের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আগে আমরা সাধারণ পদ্ধতিতে ছাগল পালতাম, প্রায়ই অসুখে ভুগে মারা যেত। এখন মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন করায় রোগবালাই প্রায় হয় না বললেই চলে, তাই আমরাও লাভবান হচ্ছি।’

১ হাজার নারী প্রশিক্ষিত, ৬২৫ জন পেয়েছেন মাচা ঘর

ইতোমধ্যে চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায় ১৯টি ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার নারীকে এই প্রকল্পের আওতায় মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং প্রায় ৬২৫ জন সদস্যকে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনের জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্প সমন্বয়কারীর বক্তব্য

পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) এর বাস্তবায়নাধীন আরএইচএল প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মেহেদী আজম বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ও মাচা পদ্ধতির সমন্বয়ে ছাগল পালন শুধু লাভজনক নয়, এটি টেকসই কৃষি ও গ্রামীণ সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্ত। মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতের সাথে সাথে ছাগলের সুস্থ ও অধিক উৎপাদন সাফল্যের পথকে আরও সহজ করে তোলে।’

টেকসই সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য

এফডিএ-এর সিনিয়র প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী শংকর চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ নারীদের মধ্যে একটি টেকসই সক্ষমতা তৈরি করা। মাচা পদ্ধতি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও অত্যন্ত কার্যকর। আমরা নারীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি এবং তাদের আত্মবিশ্বাস দেখে আমরা আশাবাদী যে এই মডেলটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।’

পরিচালকের মতামত

পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আরএইচএল প্রকল্পের কর্মকান্ড বাস্তবায়নে পিকেএসএফ-এর সহায়তায় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। এটি আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করে ছাগলের মৃত্যুহার কমানো, প্রজনন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। মাচা পদ্ধতিতে লালন-পালনের ফলে ছাগলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং স্বাস্থ্য ও প্রজনন ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। অনেকেই ছাগলের মল-মূত্র পরিবেশবান্ধব উপায়ে সংরক্ষণ করে পরিবেশ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।’

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রশংসা

চরফ্যাশন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাজন আলী বলেন, ‘মাচা পদ্ধতি একটি বিজ্ঞানসম্মত ও লাভজনক উপায়। এর মাধ্যমে অল্প জায়গায় অধিক ছাগল পালন করা যায় এবং স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এড়ানো সম্ভব হওয়ায় রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। এফডিএ-র এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমরা সরকারিভাবেও এই খামারিদের সব ধরনের পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি।’

এক সময়ের অসহায় আনোয়ারা বেগম আজ একজন সফল খামারি ও উদ্যোক্তা। তার একটি ছাগল থেকে শুরু হওয়া খামারটি এখন শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো চরফ্যাশন ও মনপুরার দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য স্বপ্ন দেখার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।