শ্রম আইন সংশোধন: ভারসাম্যহীনতা ও শ্রমিক অধিকারের প্রশ্ন
শ্রম আইন সংশোধন: শ্রমিক অধিকারের সংকট

শ্রম আইন সংশোধন: ভারসাম্যহীনতার নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের শ্রম খাত দীর্ঘদিন ধরে এক জটিল ও ভারসাম্যহীন বাস্তবতার মুখোমুখি। এখানে একদিকে রয়েছে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির চাপ ও মালিকপক্ষের স্বার্থ, অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের নিরন্তর সংগ্রাম। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শ্রম (সংশোধন) বিলটি এই ভারসাম্য রক্ষার পরিবর্তে একতরফা প্রবণতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা কমানো এবং শ্রমিকের সংজ্ঞা সংকুচিত করার মতো সিদ্ধান্তগুলো একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এই আইন সংশোধন আসলে কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে?

ট্রেড ইউনিয়ন সীমিতকরণ: শ্রমিক অধিকারের পশ্চাদপসরণ

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ পাঁচটি ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু নতুন বিলে সেটিকে আবার কমিয়ে তিনটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা কার্যত পুরোনো সীমাবদ্ধ অবস্থাতেই ফিরে যাওয়ার শামিল। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার পরিসর সীমিত করা মানে তাঁদের দর–কষাকষির ক্ষমতা ও সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে দুর্বল করা। সরকার যদি সত্যিই শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে চাইত, তাহলে এই সুযোগ সংকুচিত না করে বরং কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দিকে মনোনিবেশ করত।

শ্রমিক সংজ্ঞা সংকুচিতকরণ: সুরক্ষার বাইরে বড় একটি অংশ

একইভাবে শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাদ দেওয়া হয়েছে, যা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি উল্লেখযোগ্য অংশের কর্মজীবী মানুষকে শ্রম আইনের সুরক্ষা ও সুযোগ–সুবিধা থেকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আধুনিক কর্মপরিবেশে ‘শ্রমিক’ ও ‘কর্মচারী’—এই প্রচলিত বিভাজন ক্রমেই অস্পষ্ট ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। ফলে এ ধরনের সংকীর্ণ ও পুরোনো সংজ্ঞা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি শ্রম অধিকারের পরিসরকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভবিষ্য তহবিলের বিধান: দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

আরও উদ্বেগজনক হলো ভবিষ্য তহবিলের বিধানে আনা পরিবর্তন। আগে যেখানে ১০০ বা তার বেশি শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্য তহবিল বাধ্যতামূলক ছিল, সেখানে এখন দুই–তৃতীয়াংশ কর্মী জাতীয় পেনশন স্কিমে যুক্ত হতে চাইলে মালিকপক্ষকে ভবিষ্য তহবিল গঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় শ্রমিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এ ধরনের সম্মতি আদায় করা কঠিন নয়, যা শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার অভাব ও অংশগ্রহণহীনতা

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিয়ে। শ্রম আইন সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ব্যাপক আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই সংশোধনগুলোর ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। শ্রমিকনেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিসিসিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার মাধ্যমে যে খসড়া চূড়ান্ত হয়েছিল, তা রাতারাতি পরিবর্তন করা হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, মালিকপক্ষের দাবি ও আপত্তিগুলো দ্রুত বিবেচনায় নেওয়া হলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তি উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটি যদি সত্য হয়, তাহলে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ভারসাম্যের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থায় শ্রম আইন এমন হওয়া উচিত, যা সব পক্ষের মতামতের সমন্বয়ে তৈরি হয় এবং সামগ্রিক শ্রম কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়।

আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও ভাবমূর্তির ঝুঁকি

আইন সংশোধনের এ প্রক্রিয়া শুধু নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নই তোলে না, বরং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৪৪ নম্বর কনভেনশন অনুযায়ী, শ্রম আইন প্রণয়নে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ অপরিহার্য। সেই মানদণ্ড উপেক্ষা করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা রপ্তানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইতিবাচক দিক ও মৌলিক সংকট

অবশ্য সরকার কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও রেখেছে, যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি, উৎসব ছুটি বাড়ানো কিংবা মজুরি বোর্ড গঠনের সময়সীমা নির্ধারণ। কিন্তু এসব ইতিবাচক দিক বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবকে ঢেকে রাখতে পারছে না। কারণ, শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি মৌলিক; এখানে আপস বা সংকোচনের কোনো সুযোগ নেই।

উপসংহার: পুনর্বিবেচনার আহ্বান

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই শ্রম অধ্যাদেশ সংশোধন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়ন ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। সরকার যদি সত্যিই একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও উৎপাদনশীল শ্রমব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তাহলে এই আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। অন্যথায় শ্রম আইনের কাঙ্ক্ষিত সুফল বাস্তবে শ্রমিকদের জীবনে পৌঁছাবে না এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।