সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের মাঝে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা একটি উল্লেখযোগ্য আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান চাকরির প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার প্রেক্ষাপটে এই বয়সসীমা পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো হচ্ছে। সম্প্রতি সংসদীয় বিশেষ কমিটির এক বৈঠকে এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যা দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়সসীমার ইতিহাস ও বর্তমান প্রস্তাবনা
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তন এবং শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে অন্তর্বর্তী সরকার এই সীমা বাড়িয়ে ৩২ বছর নির্ধারণ করে। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ নামক একটি সংগঠন ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের দাবিতে সক্রিয় আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দাবির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করা হলে 'বিপর্যয় ঘটে যাবে'। তাঁর যুক্তি ছিল, এই বয়সে চাকরি পেলে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মক্ষেত্রে যোগদানের সময় তাদের বয়স ৩৭ বছর ছাড়িয়ে যাবে, যা দক্ষতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠকে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় হুইপ ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান জানান, কমিটির সবাই ৩২ বছর বয়সসীমা রাখতে একমত হয়েছেন।
তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে ৩৫ বছর বয়সসীমা করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে, সরকারি দল এই প্রস্তাবটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের সুযোগ রাখে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে সব রাজনৈতিক পক্ষই একমত, এবং এটি সংসদে নতুন বিল আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রবল গণআন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার চাকরিতে বয়সের আবেদনসীমা ৩৫ প্রত্যাশী শিক্ষার্থী সমন্বয় পরিষদ-এর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি কমিটি গঠন করে। সাবেক উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এই কমিটি বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করে।
অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্বশাসিত সংস্থায় সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ বছর করে অধ্যাদেশ জারি করে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অনেক দেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বিবেচনার দিক।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা
সংসদীয় কমিটির এই সিদ্ধান্ত দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য আশার আলো হিসেবে দেখা দিয়েছে। বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়, যার মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রফিকুল ইসলাম খান উল্লেখ করেন, বৈঠকে আলোচিত অধিকাংশ অধ্যাদেশ সুপারিশ আকারে সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে।
প্রথম দিনের বৈঠকে ২৭টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়, যার মধ্যে পাঁচটি ছাড়া বাকিগুলোর অধিকাংশ বিষয়ে কমিটির সদস্যরা একমত পোষণ করেন। এই সিদ্ধান্তগুলো সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে একটি স্থিতিশীল ও যুগোপযোগী নীতি নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।



