ঈদের আনন্দের মাঝেও জীবিকার তাড়নায় রাজধানীর রিকশাচালকদের সংগ্রাম
ঈদুল ফিতরের পরদিন, যখন বেশির ভাগ মানুষ নতুন পোশাক পরে পরিবার-স্বজনের সঙ্গে সময় কাটাতে ব্যস্ত, তখন রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পায়ে চালিত ও ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকেরা যাত্রী নিয়ে ছুটছেন। জীবিকার তাগিদের কাছে ঈদের আনন্দ তাঁদের জন্য গৌণ হয়ে পড়েছে।
ফার্মগেট এলাকায় রফিকুল ইসলামের কাহিনি
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। মাথায় গামছা বাঁধা, পরনে পুরোনো শার্ট ও লুঙ্গি। তিনি জানান, গাড়ি ভাড়া না থাকায় ঈদে বাড়ি যেতে পারেননি। ঈদের আগে যা টাকা ছিল, সবটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। দুই মেয়ে, দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার তাঁর। ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায় তাঁর বাড়ি, আর ঢাকায় তেজকুনিপাড়ায় থাকেন। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন, দিনে ৪০০ টাকায় ভাড়ায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। মাসে বা দুই মাসে একবার বাড়িতে যান বলেও জানান তিনি।
আবদুল বারেক মিয়ার ক্লান্তি ও সংগ্রাম
রফিকুল ইসলামের রিকশা থেকে কয়েক গজ দূরে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আবদুল বারেক মিয়া। পুরোনো শার্টের সঙ্গে নতুন লুঙ্গি পরেছেন, তবে শরীরজুড়ে ক্লান্তির ছাপ। ঈদ কেমন কাটল, এমন প্রশ্নে তিনি কিছু সময় নীরব থাকেন। পরে বলেন, রিকশা না চালালে আয় হবে না, তাই বের হয়েছেন। শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে তাঁর বাড়ি, দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, এখন ছেলেকে নিয়ে স্ত্রী থাকেন। ঈদে যেতে পারেননি, সামনের পয়লা বৈশাখে যাবেন বলে জানান।
হামিদ মণ্ডলের হতাশা ও আশা
ফার্মগেট থেকে কিছুদূর এগিয়ে কারওয়ান বাজার এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক হামিদ মণ্ডলের সঙ্গে কথা হয়। পরনে পাঞ্জাবি–লুঙ্গি আর কোমরে গামছা বাঁধা। তিনি বলেন, ঈদে বাড়ি যাওয়া হয়নি, তাই বের হয়েছেন, বসে থাকলে টাকা আসবে না। ঢাকার মগবাজারে থাকেন তিনি, আর স্ত্রী ও সন্তানেরা জয়পুরহাটে। ঈদের কয়দিন রিকশা চালানো শেষে বাড়িতে যাবেন বলে জানান। যাত্রী কম থাকায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, রাস্তা ফাঁকা থাকলেও যাত্রী কম, অনেকে বাসায় থাকেন বা নিজের গাড়িতে চলেন।
মো. রঞ্জুর জীবনের গল্প: অর্থকষ্ট ও আক্ষেপ
হামিদ মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলার সময় আরেক রিকশাচালক মো. রঞ্জু কৌতূহলী হয়ে শুনতে আসেন। ৫৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ বলেন, ঈদে গাড়ির ভাড়া বেশি থাকে, তাই বাড়ি যাননি। জীবিকার তাগিদে বের হয়েছেন, কারণ গরিব মানুষের কাজ করতেই হয়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে জন্মস্থান বগুড়া ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসেন তিনি। ঈদুল ফিতর কেমন কাটল, এমন প্রশ্নে বলেন, তেমন যাত্রী নেই, সবাই বাড়ি চলে গেছেন। সদরঘাট থেকে খালি রিকশা নিয়ে এসেছেন।
গল্প-আলাপে রঞ্জু মিয়া জানান, অর্থকষ্টেই তিনি ঢাকায় আসেন। পায়ে চালিত রিকশার পাশাপাশি কারওয়ান বাজারে কলার আড়তে কাজ করেন। এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে বগুড়ায় থাকেন তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে পড়াশোনা করছেন। তাঁর জীবনের গল্পে হতাশা ও না পাওয়ার আক্ষেপ ভরা। তিনি বলেন, অর্থকষ্টেই জীবন কাটল, এখন আর আগের মতো রিকশা চালাতে পারেন না।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রিকশাচালকদের অবস্থা
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ঈদের পরদিনও অনেক রিকশা ও অটোরিকশাচালক রাস্তায় বের হয়েছেন। কেউ পরিবারের জন্য, কেউ গ্যারেজের জমা দেওয়ার জন্য, কেউবা শুধু দৈনিক আয় নিশ্চিত করতে। তাঁদের কারও কাছে ঈদ মানে দিন শেষে হাতে কিছু টাকা থাকা, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। এই সংগ্রামী মানুষদের জীবনযাত্রা আমাদের সমাজের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যেখানে আনন্দের মাঝেও জীবিকার লড়াই চলছে অবিরাম।



