ঈদের আনন্দে পেশাদারি দায়িত্ব: এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী থেকে সাংবাদিকের গল্প
প্রযুক্তির এই যুগে ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানোর চেয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা অনেকের কাছেই সহজ ও সুবিধাজনক। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময়ে গ্রাহকরা তাঁদের কার্ড ব্যবহার করে টাকা তুলে নিতে পারেন। ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকলেও এটিএম বুথ চালু থাকে, কিন্তু এই স্বস্তি দেওয়ার জন্য যাঁরা দিনরাত কাজ করেন, তাঁদের ঈদের গল্পগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে তাঁরা দিনরাত পাহারা দেন এটিএম বুথে।
সারোয়ার হোসেন: ৯ বছর ধরে ঈদে ছুটি নেই
নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকে ঢাকায় এসে এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করছেন সারোয়ার হোসেন। গত ৯ বছরে একবারও ঈদে ছুটি কাটাননি তিনি। ১৫ মার্চ রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। ব্যাংক একটি কোম্পানি থেকে তাঁর মতো নিরাপত্তাকর্মীদের নিযুক্ত করেছে, যেখানে তিন পালায় ১২ জন দায়িত্ব পালন করেন। ঈদের দিনও ভাগাভাগি করে দায়িত্ব পালন চলে, সাধারণত এক ঈদে যাঁরা ছুটি নেন না, তাঁরা অন্য ঈদে ছুটি পান।
সারোয়ার হোসেন বলেন, “ঈদে কখনো ছুটি নেননি আমি। এবারও ঈদে এটিএম বুথ পাহারা দেওয়ার ডিউটি পালন করব। ডিউটির সময় দীর্ঘ—সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত, ১৬ ঘণ্টা। সকাল ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত আমার নিয়মিত ডিউটি, এরপর রাত ১০টা পর্যন্ত ওভারটাইম। আট ঘণ্টা ওভারটাইমের জন্য দিনে ২৪০ টাকা পাই। লম্বা সময় দায়িত্ব পালনে পরিশ্রম হলেও ওভারটাইম করি, কারণ মাসে ৯ হাজার টাকা বেতন দিয়ে সংসার চালানো যায় না।”
পরিবার থেকে দূরে, দায়িত্বের পথে
পরিবারের সঙ্গে সারোয়ারের দেখা হয়নি তিন মাস। তাঁর স্ত্রী, ৯ মাস বয়সী ছেলে, মা–বাবা ও ভাইবোন গ্রামে থাকেন এবং কৃষিকাজ করেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ঢাকায় এসে চাকরি করছেন। ঈদের জন্য তিনি গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছেন, পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই কেনাকাটা করেছেন।
সারোয়ারের সুপারভাইজার আনোয়ার হোসেন ২২ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন। তিনি বলেন, বছরে একবার ঈদে তিনি ছুটি পান এবং এবার ঈদে ছুটি নেবেন। এই ঈদে মোট চারজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। দুই মাস আগে যোগ দেওয়া নিরাপত্তাকর্মী আশিকুজ্জামান আকাশও এই ঈদে ছুটি পাবেন না, আর পাঁচ বছর ধরে কাজ করা রাকিবুল ইসলাম জানেন না তিনি ঈদে ছুটি পাবেন কি না।
রাকিবুল ইসলাম বলেন, “কর্ম তো করতে হবে, কর্মকে ছোট করে দেখতে নেই। আমি পাঁচ বছর ধরে এই পেশায়, এর মধ্যে একবার ঈদে ছুটি কাটিয়েছি। এবার শেষ মুহূর্তে ছুটি পেলে স্ত্রী ও ৯ মাসের একমাত্র সন্তান নিয়ে বরগুনায় গ্রামের বাড়িতে যাব।”
অন্যান্য পেশাজীবীদের ঈদের দায়িত্ব
সারোয়ারের মতো এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী ছাড়াও ট্রাফিক পুলিশ, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ফায়ার সার্ভিস, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান, সুপারশপ ও মুদিদোকানের কর্মীরা ছুটি না নিয়ে ঈদের দিনে কাজ চালিয়ে যান। জনগণের সুরক্ষায়, যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ও সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঈদের দিনও কাজ করেন ট্রাফিক পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক কনস্টেবল রিয়াজুল হক বলেন, “বছরে দুটি ঈদের একটিতে ছুটি পাই আমি। এবার ঈদে আমাকে কাজ করতে হবে। কুড়িগ্রাম সদরে মা–বাবা ও ভাইবোন থাকেন, আমি স্ত্রী ও স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান নিয়ে ঢাকার সবুজবাগ এলাকায় বাস করি। ঈদে ছুটি পেলে গ্রামের বাড়ি চলে যাই।”
চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের ভূমিকা
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক মো. সাব্বির আহমেদ বলেন, “আমার বাড়ি রংপুর শহরে। অন্যবারের মতো এবারও ঈদের দিন নামাজ শেষে হাসপাতালে চলে আসব। ঈদের দিন পালা করে পাঁচ থেকে ছয়জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করবেন। রোগীরা চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষায় থাকেন, চিকিৎসককে দেখলে স্বস্তি পান। সেই স্বস্তিটুকু আমরা রোগীদের দিতে চাই।” তিনি আট বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন এবং চার বছর ধরে সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন, কখনো ঈদে ছুটি পাননি।
একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বিশেষ প্রতিনিধি ও নিউজ প্রেজেন্টার ফারহানা ন্যান্সি ১৫ বছর সাংবাদিকতা পেশায় আছেন। তিনি বলেন, “আমি যে পেশায় আছি, তা আর দশটা পেশার মতো নয়। ঈদের দিন দায়িত্ব পালন করাকে কোনো সমস্যা বলে মনে করি না।” তিনি বছরে এক ঈদে অফিস করেন, আরেক ঈদে ছুটি নেন এবং এবার ছুটি নেননি। ঈদের দিন পেশাগত কাজের সঙ্গে ব্যক্তিজীবনকে সামঞ্জস্য করে নিয়েছেন তিনি, সংসারের কাজ ঈদের আগের দিন গুছিয়ে ফেলেন এবং অফিস শেষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান।
সারোয়ারের পরিবারের প্রত্যাশা
নিরাপত্তাকর্মী সারোয়ার হোসেন বলছিলেন, ঈদে ডিউটি করার অভ্যস্ততা তাঁর হলেও পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় মন খারাপ করেন। তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন, এবং স্ত্রী এত দিন কিছু বলেননি, কিন্তু এখন সন্তান হওয়ার পর একসঙ্গে ঈদ করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্ত্রী এবার তাঁকে ঈদুল আজহায় ছুটি নিতে বলেছেন, এবং তিনিও ছুটি নেওয়ার কথা ভাবছেন।
এই গল্পগুলো দেখায় যে, ঈদের উৎসবে অনেক পেশাজীবী তাঁদের ব্যক্তিগত আনন্দকে ত্যাগ করে সমাজের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন, যা আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।



