বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা: বাংলাদেশের তরুণ কর্মসংস্থান সংকট ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ
একটি রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপের জন্য বহু সূচক থাকলেও, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক হলো রাষ্ট্রটি তার নাগরিকদের, বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীকে, কতটা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারছে। কারণ, কর্মহীন জনসংখ্যা কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে ঘাটতি তৈরি করে না—এটি সমাজের ভেতরে নীরব অস্থিরতার জন্ম দেয়, যা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান সংকটে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ আজ সেই সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী—যাকে আমরা গর্বভরে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট' বলি—আসলে এক দ্বিমুখী সম্ভাবনা বহন করে। যথাযথ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই শক্তিকে উৎপাদনশীল ধারায় প্রবাহিত করা গেলে এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে; কিন্তু যদি এই জনগোষ্ঠী কর্মহীনতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ থাকে, তাহলে এটি অস্থিতিশীলতার উৎসে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্টের উদ্বেগজনক বক্তব্য
এই বাস্তবতাকে সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে স্পষ্ট করে তুলেছেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট। তিন দিনের ঢাকা সফর শেষে তিনি উল্লেখ করেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণ চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তরুণীদের ক্ষেত্রে এই বঞ্চনা আরও প্রকট। একই সময়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ, অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যার অমিল নয়—এটি একটি ক্রমবর্ধমান শূন্যতার প্রতিচ্ছবি, যা অর্থনীতি ও সমাজ— উভয়ের ভিতরেই চাপ সৃষ্টি করছে।
কর্মহীনতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি
প্রশ্ন হলো, এই শূন্যতার পরিণতি কী? প্রথমত, দীর্ঘস্থায়ী কর্মহীনতা তরুণদের মানসিক জগতে গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। যখন শিক্ষা ও যোগ্যতার পরও কর্মের সুযোগ মিলে না, তখন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়। এই বিচ্ছিন্নতাই অনেক সময় বিপথগামিতার সূচনা করে—অপরাধ, সহিংসতা কিংবা অন্য কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও কঠিন। কর্মহীন জনগোষ্ঠী উৎপাদনে অংশগ্রহণ না করলেও তাদের অন্নসংস্থানের প্রয়োজন অব্যাহত থাকে। ফলে, খাদ্য সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের উপর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। একটি পর্যায়ে গিয়ে এই চাপ রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠতে পারে।
সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা
এই প্রেক্ষাপটে জোহানেস জাটের সতর্কবাণী বিশেষভাবে গুরুত্ববহ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে যেসব মৌলিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান, তা দূর করার জন্য দীর্ঘদিনের অপেক্ষমাণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এটি কেবল নীতিগত পরামর্শ নয়; বরং বর্তমান বাস্তবতার এক অবধারিত দাবি। তবে সংস্কার মানেই কেবল নীতিপত্র প্রণয়ন নয়—এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত থাকে বাস্তবায়নে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পায়নের বিস্তার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদান এবং সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা—এই সব বিষয় একযোগে বিবেচনায় আনতে হবে। অন্যথায়, ডিগ্রিধারী কিন্তু দক্ষতাহীন এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী তৈরি হতে থাকবে, যারা কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বে।
অস্তিত্বগত প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অতএব, আজকের মূল প্রশ্নটি আর কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি অস্তিত্বগত। বাংলাদেশের এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী কি হবে উন্নয়নের শক্তি, নাকি অব্যবস্থাপনার ফলে এক অদৃশ্য সংকটের উৎস হয়ে উঠবে? বিশ্বের বহু দেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হয়েছে, কারণ তারা সময়মতো তাদের জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পেরেছে। বাংলাদেশকেও সঠিক পরিকল্পনায় এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট'-এর অমূল্য ফসল ঘরে তুলতে হবে। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—যে রাষ্ট্র তার তরুণদের কর্মে নিয়োজিত করতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কখনো স্থিতিশীল হয় না। ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট' এক অর্থে তেজস্বী আগুনতুল্য। এই মূল্যবান আগুনের সঠিক ব্যবহার করতে হবে, নচেৎ এই আগুনই ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
