কর্মসংস্থানের সংকটে অটোরিকশা: ছিনতাই ও দুর্ঘটনার নতুন আতঙ্ক
বর্তমান সময়ে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে পড়ে অনেক মানুষ ঋণের টাকায় অটোরিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো হালকা যান কিনে রাস্তায় নামছেন। এই পন্থা আয়ের একটি উৎস হিসেবে দেখা দিলেও, এর ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, এসব হালকা যান এখন ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে খুনোখুনির মতো ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।
ফেনীর মর্মান্তিক ঘটনা: ১৫ বছরের কিশোরের প্রাণহানি
ফেনীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সংঘটিত একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাত্রীবেশে থাকা ছিনতাইকারীরা চালক শান্ত কুমার সাহাকে ডোবায় ফেলে দিয়ে তার অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়। শান্ত, যিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর, নিজের বাবার উপার্জনের শেষ সম্বলটি বাঁচাতে মরিয়া হয়ে মহাসড়কে দৌড়াতে গিয়ে পেছন থেকে আসা একটি ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান। এই ঘটনা সমাজের নিরাপত্তাহীনতার করুণ চিত্র তুলে ধরে, যেখানে একদিকে অপরাধী চক্র সক্রিয়, অন্যদিকে বিশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থা একজন খেটে খাওয়া তরুণের জীবন কেড়ে নেয়।
পুলিশের নজরদারি ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
মহাসড়কের পাশে নির্জন স্থানে যেভাবে যাত্রীবেশে ছিনতাইকারীরা সক্রিয় রয়েছে, তা স্থানীয় পুলিশের টহল ও নজরদারি ব্যবস্থার উপর বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি করে। যদি মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অপরাধীরা এত সহজে অপরাধ সংঘটিত করে পালিয়ে যেতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? শান্তর চাচা রিপন সাহার দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করলে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সম্ভব। আশা করা হচ্ছে, পুলিশ কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুততম সময়ে এই খুনি ছিনতাইকারীদের আইনের আওতায় আনবে।
হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা ও হালকা যানের দৌরাত্ম্য
এখানে হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বও প্রশ্নের মুখে। মহাসড়কে হালকা যান চলাচলের কোনো সুযোগ নেই বলে নিয়ম থাকলেও, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের অনেক অংশে অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা বা শিথিলতার কারণে এসব যান মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে, ফলে নিয়মিত হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতির জন্য পুলিশের দায়িত্ব নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিশুশ্রম ও প্রান্তিক মানুষের সংকট
১৫ বছরের একজন কিশোরের হাতে অটোরিকশা তুলে দেওয়ার ঘটনা প্রান্তিক মানুষের চরম অভাব ও শিশুশ্রমের ভয়াবহতাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। যে বয়সে শান্তর স্কুলে পড়াশোনা বা খেলাধুলায় মগ্ন থাকার কথা ছিল, সেই বয়সে তাকে পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় জীবন দিতে হয়েছে। এই দায় সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঁধে বর্তায়, যা শিশুশ্রম বন্ধ ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করার জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সমাধানের পথ: নজরদারি বৃদ্ধি ও অপরাধ দমন
মহিপাল হাইওয়ে পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করেছে বলে জানা গেছে, কিন্তু মূল অপরাধী সেই ছিনতাইকারীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। মহাসড়কের প্রতিটি পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো এবং ছিনতাইকারী চক্রের মূলোৎপাটন করা এখন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, শান্তর মতো আরও অনেক নিরীহ প্রাণ ঝরে যাবে, এবং আমরা কেবল শোক প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করব। এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের অপরিহার্য দাবি।
