নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানায় বেতন বকেয়ার প্রতিবাদে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, ২০ জন আহত
নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানায় বেতন বকেয়ার প্রতিবাদে সংঘর্ষ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পোশাক কারখানায় বেতন বকেয়ার প্রতিবাদে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় একটি রফতানিমুখী পোশাক কারখানায় বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ না করা, ছাঁটাই ও নির্যাতনের অভিযোগে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শনিবার সকাল থেকে শ্রমিকদের বিক্ষোভের জেরে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যাতে শ্রমিক, পুলিশ, সাংবাদিক ও পথচারীসহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন।

মহাসড়ক অবরোধে তীব্র যানজট ও ভোগান্তি

ঘটনার প্রতিবাদে শ্রমিকরা প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। এর ফলে সড়কের উভয় পাশে প্রায় ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। যানজটে আটকা পড়ে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন, যার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও পথচারীরা। অনেক জায়গায় শ্রমিকদের সঙ্গে যানবাহন চালক ও যাত্রীদের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

কারখানায় বেতন বকেয়া ও নির্যাতনের অভিযোগ

জানা গেছে, সকাল ৮টার দিকে রূপগঞ্জ উপজেলার মইকুলি এলাকায় অবস্থিত বি ব্রাদার্স কোম্পানি লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় এ শ্রমিক অসন্তোষের সূত্রপাত হয়। ভুক্তভোগী শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, কারখানায় কর্মরত প্রায় তিন হাজার শ্রমিক ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা এখনও পাননি। মালিকপক্ষ বারবার আশ্বাস দিলেও অর্থ পরিশোধ করা হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।

শ্রমিকরা আরও অভিযোগ করেন যে, বকেয়া দাবিতে প্রতিবাদ জানালে তাদের কারখানার ভেতরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং একাধিক শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। বিশেষ করে, প্রতিবাদ করায় কারখানার ডাইং ও ফিনিশিং সেকশনের শ্রমিক সজীব মিয়াকে মালিকপক্ষের লোকজন বেধড়ক মারধর করেছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া যারা বকেয়া বেতন নিয়ে কথা বলছেন, তাদের একে একে ছাঁটাই করা হচ্ছে।

রমজানে অনাহার ও চরম দুশ্চিন্তা

বেতন না পেয়ে রমজানে রোজা রেখে অনেক শ্রমিক অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন বলে তারা জানান। বাড়িওয়ালা ও দোকানদারদের চাপেও তারা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, যা তাদের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।

পুলিশের হস্তক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনা

শনিবার সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে কিছু শ্রমিক কারখানার সামনে অবস্থান নিলে ভেতরের শ্রমিকদের বাইরে যেতে বাধা দেওয়া হয়, যার ফলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। পরে উত্তেজিত শ্রমিকরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।

বেলা সাড়ে ১০টার দিকে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেন। তবে সমঝোতা ব্যর্থ হলে বেলা পৌনে ১টার দিকে ওসি সাবজেল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে লাঠিচার্জ করে। এতে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

ভাঙচুর ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ

সংঘর্ষ চলাকালে উত্তেজিত শ্রমিকরা সড়কে আটকে থাকা বাস, ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন ও কারখানার কিছু অংশ ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ একাধিক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ইটপাটকেল ও টিয়ারশেলের আঘাতে শ্রমিক, পুলিশ, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। আতঙ্কে অনেক পথচারী ও যাত্রী দৌড়াতে গিয়ে পড়ে আহত হন বলে জানা গেছে।

উত্তেজনা অব্যাহত ও কর্তৃপক্ষের নীরবতা

ঘটনাস্থলে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। একইভাবে পুলিশের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতির জটিলতা বাড়িয়ে তুলছে।