শিক্ষিত নারীদের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তি এখনও চ্যালেঞ্জ
শিক্ষিত নারীদের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তি চ্যালেঞ্জ

নারীদের শিক্ষায় ধারাবাহিক অগ্রগতি হচ্ছে দেশে। উদাহরণ হিসেবেও ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয় এই অগ্রগতি। তবে, এখনও লাখ লাখ শিক্ষিত নারী শ্রমশক্তির বাজারের বাইরে। এমনকি, শ্রমশক্তির বাজারে নারীদের ক্ষেত্রে এখনও স্থায়ী ও ব্যয়বহুল বৈপরীত্য রয়ে গেছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জন এবং উচ্চশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার এই ব্যবধান এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসছে।

পরিসংখ্যানে নারী শ্রমশক্তি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, শ্রম বাজারে নারীদের অংশগ্রহণের হার ৩৬ থেকে ৩৮ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অংশগ্রহণের হারের বাইরে, কর্মসংস্থানের মানও গভীর বৈষম্য তুলে ধরে। কর্মরত নারীদের প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অনানুষ্ঠানিক খাতে সাধারণত কম মজুরি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সীমিত আইনি সুরক্ষা বিদ্যমান।

নারীরা কাজ করলেও তারা আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে রয়ে যাচ্ছে। নারীদের কর্মসংস্থান এখনও অত্যন্ত সীমিত ও কয়েকটি খাত কেন্দ্রীভূত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রধান খাতসমূহ

  • তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি): বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতির মূল ভিত্তি আরএমজি সেক্টর। এই সেক্টরে লাখ লাখ নারী কর্মরত রয়েছেন। এ খাতের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশই নারী।
  • কৃষি খাত: মূলত গ্রামের নারীরা এই খাতে যুক্ত। তবে, এই খাতে যুক্ত বেশিরভাগ নারী অবৈতনিক বা স্বল্প মজুরিতে পারিবারিক শ্রমিক হিসেবে অবদান রাখেন।
  • স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা খাত: স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা খাতে নারীদের ভূমিকা অপরিসীম। যদিও এই খাতে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পেশাগত অবস্থান নিয়ে এখনও নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নারীরা নার্সিং ও ধাত্রীবিদ্যায় উল্লেখযোগ্যভাবে কাজ করছে।
  • শিক্ষা: শিক্ষা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বর্তমানে ব্যাপক। তবে, সেটি প্রাইমারি ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।
  • এনজিও ও উন্নয়ন সেক্টর: এই খাতে নারীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। নারীরা কমিউনিটি পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
  • ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোগ: নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান হলেও এখনও সীমিত। সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা দিলেও পুরুষদের মতো উদ্যোক্তা হতে পারছেন না নারীরা।

তবে, এসটিএম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পখাতে নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম, যা কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক উভয় ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে প্রতিফলিত করে।

বাস্তব জীবনের গল্প

এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, যা শুধুমাত্র যোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত নানা বাধার দ্বারা প্রভাবিত।

২৮ বছর বয়সী রুবিনা আক্তার কাজ করেন সাভারের একটি তৈরি পোশাক কারখানায়। তিনি বলেন, “আমি এক দশক ধরে একটি কোম্পানিতে কাজ করছি। আমার আয়ে পরিবার চলে, কিন্তু নিরাপত্তা সবসময়ই একটি উদ্বেগের বিষয়। প্রায়শ অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। কিন্তু, পারিশ্রমিক ও সুবিধা সবসময় সেই পরিশ্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”

কৃষি খাতে কাজ করেন ৩৫ বছর বয়সী মমতা রানী। কুড়িগ্রামের এই নারী বলেন, “মাঠে আমরা পুরুষদের সমানই কাজ করি। কিন্তু, পুরুষদের তুলনায় আমাদের আয় কম। আমাদের অবদান খুব কমই স্বীকৃতি পায়।”

৩০ বছর বয়সী সাবিনা ইয়াসমিন রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যসেবায় আরও কর্মী প্রয়োজন। কাজের চাপ অনেক বেশি। শিফটি ডিউটির কারণে পেশাগত ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।”

প্রকৌশলে স্নাতক করা লামিয়া খান বলেন, “অনেক আশা নিয়ে আমি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলাম। কিন্তু, চাকরির সুযোগ সীমিত। নিয়োগদাতারা প্রায়শ পেশাগত দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেন।”

খ্যাতনামা এনজিওকর্মী ৩২ বছর বয়সী শারমিন আক্তার বলেন, “অনেক নারী কাজ করতে চান। কিন্তু, সামাজিক রীতিনীতি ও নিরাপত্তা উদ্বেগ তাদের সীমাবদ্ধ করে ফেলে। পারিবারিক সহায়তা ছাড়া কর্মজীবন চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।”

বিশেষজ্ঞ মতামত

শ্রম অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের কম অংশগ্রহণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার প্রতিফলন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ’র (বিলস) পরিচালক নাজমা ইয়াসমিন বলেন, “প্রায় ৮৫ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, যেখানে কার্যত কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেই। নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাদের সন্তান।”

তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রের অপর্যাপ্ত নীতি এবং বিদ্যমান শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগ, এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে।”

শিশুযত্ন ও পরিবহন চ্যালেঞ্জ

সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য শিশুযত্ন কেন্দ্র না থাকা নারীদের কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন সরকারি দফতর এবং কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান ডে-কেয়ার সুবিধা চালু করেছে। তবুও এর আওতা এখনও অত্যন্ত সীমিত। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার চালু করলেও তা শুধুমাত্র নিয়ম মানার উদ্দেশে করা। এগুলোর কার্যকারিতা সীমিত।

ঢাকার মতো শহরগুলোতে চলাচলের সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভিড় ও অনিরাপদ গণপরিবহন কর্মজীবী নারীদের প্রতিদিনের যাতায়াতকে কঠিন করে তুলে, বিশেষ করে সন্তানসহ নারীদের। নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য গণপরিবহন ব্যবস্থার অভাব শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকে আরও নিরুৎসাহিত করে।

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে নারীরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। অনেকেই তাদের সন্তানদের গ্রামে স্বজনের কাছে লালন-পালনের জন্য পাঠিয়ে দেন, যার ফলে দীর্ঘ সময়ের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। অন্যরা পুরোপুরি শ্রমশক্তি থেকে সরে দাঁড়ান।

একজন জ্যেষ্ঠ নারী সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই দ্বিধার কথা তুলে ধরে বলেন, “উচ্চ পর্যায়ের পদেও পেশাগত দায়িত্ব ও পারিবারিক প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া অনেক নারী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে আসেন।”

অর্থনৈতিক ক্ষতি

নারীদের শ্রমশক্তির বাজারে অংশ না নেওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক শ্রম গবেষণার মতে, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বাংলাদেশের জিডিপি ও উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

কর্মসংস্থানে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতির দেশের জন্য। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, ধাপে ধাপে ছোটখাটো পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। নারীদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয় পরিবর্তন

  1. সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে শিশুযত্ন অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা।
  2. নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং হয়রানিবিরোধী আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
  3. রিমোটলি ও পার্ট-টাইম কাজের সুযোগসহ নমনীয় কর্মব্যবস্থা উৎসাহিত করা।
  4. শিক্ষাকে চাহিদাভিত্তিক দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
  5. লিঙ্গ সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নগর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা।
  6. নারীদের অর্থনৈতিক ভূমিকা সীমিত করে এমন সামাজিক রীতিনীতি ও ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা।

মে দিবসে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি

যে দেশ তার নারীদের শিক্ষিত করতে সফল হয়েছে, সেই দেশ কীভাবে তাদের শ্রমবাজারে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে? এই ব্যবধান দূর করা এখন আর শুধু লিঙ্গসমতার বিষয় নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা। যতদিন না নারীরা নিরাপদে, পূর্ণভাবে এবং সমানভাবে শ্রমবাজারে অংশ নিতে পারবেন ততদিন বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।